বোবার শত্রু বোবা নিজেই!
বর্তমানে বাংলাদেশে সংগীতচর্চার ওপর যে অস্বস্তিকর চাপ ক্রমশ বাড়ছে, তা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কনসার্ট বাতিল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ, সংগীতশিক্ষার পদ বাতিল—এসব যেন এক অদৃশ্য কলকাঠির দৃশ্যমান প্রবণতার অংশ হয়ে উঠেছে। আর সেই প্রবণতার ভয়াবহতম প্রতীক হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে ‘ভাইরাল’ হওয়া একটি ভিডিও। সেই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বিশেষ ‘লেবাস পরিহিত’ কয়েকজন তরুণ হারমনিয়াম-তবলা ভাঙছে লাথি দিয়ে, আজন্মের ক্ষোভ নিয়ে হাতুড়ির আঘাতে ভেঙেচুরমার করতে চাইছে মূক কিছু বাদ্যযন্ত্র। তাতেও বুঝি তাদের আক্রোশের মাত্রা শান্ত হবার নয়। সংগীতে সঙ্গত দেবার দায়ে বাদ্যযন্ত্রগুলোতে আগুন ধরিয়ে তবে তাদের শান্তি। সেই শান্তি নিয়ে তারা উল্লাস করছে।
এ দৃশ্য শুধুমাত্র বাদ্যযন্ত্র ধ্বংসের দৃশ্য ভেবে যারা সান্ত্বনা পেতে চাইছেন, তারা জেনে রাখুন, ধ্বংসের এই উৎসব একটি সমাজের সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেবার আঘাত। আঘাতে আঘাতে সমাজের মেরুদণ্ড এতটাই ভেঙে দেওয়া হবে, যখন আর কেউ সুর ভজনার সাহস দেখাতে চাইবেন না। বাংলার জল, বাংলার মাটি থেকে সুরের ঘটবে দীপান্তর। এখনও সময় আছে, সেই পরিণতি ঘটে যাওয়ার আগে সুরের মানুষ, সুরের জগৎ আলো করে থাকা শিল্পীগণ, আপনাদের বানোয়াট ঘুমের বুদবুদ ভেঙে জেগে উঠুন!
যারা আজ ধ্বংসের নেশায় মত্ত, যারা আজ তাদের ভাংচুরকে চরম বিজয় হিসেবে প্রচার-প্রচারণায় নেমেছে তাদের বুঝিয়ে দিন– আপনাদেরও অনুভূতি আছে, অনুভূতিহীন ধ্বংসপ্রাপ্ত বাদ্যযন্ত্রগুলো আপনাদের হৃৎপিণ্ডে মারণযন্ত্রণা তৈরি করছে। তার অভিঘাতে আপনারা জাগুন, চিৎকার করুন। যাতে সন্ত্রাসীরা ছিটকে যায়। বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির গায়ে আঁচড় দেবার দুঃসাহস আর যেন বাড়বাড়ন্ত না হয়।
বাংলাদেশে বহুদিন ধরে একপেশে এক আচরণ দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। নানান ছুতোয় কারো “বিশেষ” অনুভূতিতে আঘাত লাগলে চাকরি চলে যায়, পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, জনতা বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। এমনকী হত্যা পর্যন্ত জায়েজ হয়ে দাঁড়ায়। ধর্মীয় অনুভূতির নামে বিচারহীন প্রতিশোধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। বলাইবাহুল্য, সেটি নিশ্চিতভাবেই বর্তায় সংখ্যালঘু নামের এক অভিশপ্ত জনগোষ্ঠীর ওপর। তাদের ওপর কোনো অন্যায়-অনাচারে রাষ্ট্রের যেন রয়েছে নীরব সম্মতি। জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে যারা মাটি কামড়ে পড়ে থাকেন, তাদের কপালে লেখা থাকে নিরন্তর শনির নাচন। যেহেতু সংখ্যালঘু, কাজেই বিচার চাইবার বা পাওয়ার অধিকার তাদের নেই। তারা নিজের ঘরে সপরিবারে হত্যার শিকার হবেন। তাতে রাষ্ট্র-বা সমাজের কিছুই যায় আসে না। যেখানে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, সেখানে শিল্প বা সংগীত রক্ষার নিরাপত্তা আশা করা একটু বেশি হয়ে যায় না! না, তা যায় না। কারণ বিপুল সংখ্যক সংখ্যাগুরু লোকজন এই মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত। তারা নাম-যশ কামিয়েছেন, বিপুল মানুষের মনোযোগ আহ্লাদ পেয়েছেন। তার দোহাই দিয়েই আপনাদের বলছি, আপনারা আর মুখে স্কচটেপ দিয়ে রাখবেন না প্লিজ!
কনসার্ট বন্ধ হলে শিল্পীর কণ্ঠে প্রতিবাদ নেই। কোনো জেলায় সংগীতচর্চা নিষিদ্ধ হলে শিল্পীর চোখে ক্ষোভের আগুন দেখি না। ছায়ানটের ধ্বংসযজ্ঞে বিকারহীন শিল্প-সাহিত্যের লোকজন, আপনারা বুঝি জ্যোৎস্না রাতের সলমাজরিতে মত্ত! হারমনিয়াম-তবলা ভাঙলে তাই আপনাদের অন্তর কেঁপে ওঠে না। এই নিয়ে দৃশ্যত কোনো মানববন্ধন নেই, বিবৃতি নেই, অনশন নেই। একের পর এক শিল্পের ওপর আঘাত নেমে আসছে অথচ আপনারা নীরব। এ নীরবতা শুধু হতাশাজনক নয়, সাংস্কৃতিকভাবে বিপজ্জনক।
ধানমন্ডি ৩২-এর পাশে ছিল রাহুল আনন্দের বাড়ি। শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে আগুন দেওয়ার সময় তথাকথিত তৌহিদী মবসন্ত্রাসীরা রাহুলের বাড়িতেও আগুন লাগায়। তার সংগ্রহে থাকা বহু বাদ্যযন্ত্র—যেগুলো একজন শিল্পীর কাছে সন্তানের তুল্য, সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত ছিল, ছিল ভয়াবহ—এটা সত্যি। রাহুল নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবিত ছিলেন, সেটা হওয়াও খুব স্বাভাবিক। কিন্তু মূক-বধির বাদ্যযন্ত্রগুলো, যেগুলো একজন শিল্পীর কাছে সন্তানতুল্য হওয়ার কথা, সেগুলোর ধ্বংসযজ্ঞে তিনি মুখ ফুটে প্রতিবাদ পর্যন্ত করেননি। বরং সেদিনের ধ্বংস-আগুনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি যে বয়ান দিয়েছিলেন, তা ছিল অবিশ্বাস্য নতমুখী। তিনি বলেছিলেন, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে তার বাড়িতে আগুন দেয়নি; মুজিবের বাড়ির আগুন দেওয়ার হুজুগে তার বাড়িটিও পড়ে গেছে।
যদি সত্যিই “হুজুগে” পড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে তার বাদ্যযন্ত্রগুলো উদ্ধারে কেউ এগিয়ে আসেনি কেন? ঠিক আছে, তর্কের খাতিরে না হয় মেনে নেওয়া হলো ওগুলো হারাম কাজে ব্যবহারের অনুষঙ্গ। কিন্তু তারা তো মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে রক্ষায় কেউ রুখে দাঁড়িয়েছিল কি? তার পরিবারকে রক্ষায় সেদিন কেউ হয়েছিল আগুয়ান? সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কেউ প্রকাশ্যে তার পাশে সেদিন দাঁড়ায়নি কেন?
আজ প্রবাসী রাহুল ফেসবুকে সেই ঘটনার করুণ বিবরণ লিখছেন। কিন্তু তখন তিনি টু শব্দও করেননি। ন্যূনতম প্রতিবাদে সেদিন যদি রাহুল বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেন, তার দেখাদেখি আজকের সংস্কৃতিক অঙ্গনের বোবা হয়ে যাওয়া এক-দুজনের মনে হয়তো সাহস জাগতো। একজন থেকে বহুজনের প্রতিবাদের ঢেউ তৈরি হতে পারতো। দুঃখজনকভাবে সেটা হয়নি। এবং সেই নীরবতার ধারাবাহিকতা আজও চলছে।
আজ বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির জগতে শ্মশানের নীরবতা। যেন সবাই অপেক্ষা করছেন— শিল্প-সংস্কৃতির জায়গা আরো কতটা সংকুচিত হলে তারা কথা বলবেন। আরও কতটা ঘর পুড়লে তারা প্রতিবাদ করবেন। লেখক-শিল্পী সবাই বুঝি ভানুর কৌতুকের চরিত্র হয়ে যে যার অবস্থানে বসে ভাবছেন–দেখি না কী করে!
আপনাদের এই বোবা বনে যাওয়াতে সম্মিলিত প্রতিবাদের কোনো আওয়াজ উঠছে না কোথাও। যদি উঠতো—আজ সাংস্কৃতিক জগৎকে পঙ্গু করে দেওয়ার যে মচ্ছব সউল্লাসে চলছে, প্রতিরোধ তৈরি হলে সেসব করার আগে সন্ত্রাসীরা অন্তত একবার ভাবতো।
কিন্তু তারা ভাবছে না। কারণ তারা জানে—লেখক-কবি-শিল্পীরা নীরব থাকাকেই সুবিধাজনক ভাবেন, বোদ্ধা থেকে সাধারণ শ্রোতারা উদাসীন, রাষ্ট্র ব্যস্ত অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে।
বাংলাদেশের সংগীতচর্চা শত বছরের ঐতিহ্য। বাউল, লোকগান,নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান, ব্যান্ড সংগীত—সব মিলিয়ে এটি জাতির আত্মার অংশ। এই আত্মাকে আঘাত করলে শুধু শিল্পী নয়, পুরো সমাজ ক্ষতবিক্ষত হয়। আমাদের আজকের এই নীরবতা, এই ভয়, এই উদাসীনতা— এগুলো যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে সত্যিই একদিন হয়তো সুরের দেশ নীরব হয়ে যাবে। শিল্প- সাহিত্যের ভাঁড়ারে হাভাতের বসত হবে। শত কাঁদলেও উদ্ধারের কূল থেকে যাবে নাগালের বাইরে। নীরবতা দিয়ে আমরাই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম দিয়েছি। এই দানব আমাদেরই নীরবতায় তৈরি। এক ধোঁয়াশাময় সময় যেন হা রে রে রে রে, বলে ছুটে আসছে…ভয় হচ্ছে, রেনেসাঁপূর্ব ইউরোপের তামস পথে কি যাত্রা করছে আজকের বাংলাদেশ?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন