সম্পাদকীয়: পাঠভাবনা




নিসর্গের আগস্ট সংখ্যার সম্পাদকীয়টি বিগত দুই-আড়াই বছরে পড়া সাহসী এবং বস্তুনিষ্ঠ একটি সম্পাদকীয় কলাম। একটি পত্রিকার সম্পাদকীয় কেবল একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তা সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিফলন। নিসর্গের এ সংখ্যার সম্পাদকীয় কলামে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে প্রথমেই আঙুল তোলা হয়েছে মব জাস্টিস এবং ধর্মান্ধতার বিভৎসতার দিকে। পুরনো কোনো ঘটনার জের ধরে কিংবা গুজবকে কেন্দ্র করে যখন প্রকাশ্যে মানুষকে হত্যা করা হয় এবং আইনের শাসন সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়ে, তখন তা সমাজকে এক চরম অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। একই সাথে সুস্থ বিনোদন বা গান-বাজনাকে ‘অসামাজিক’ তকমা দিয়ে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য মারাত্মক হুমকি। এই মনস্তত্ত্ব সমাজকে পেছনের দিকে নিয়ে যায়। পৌঁছে দিতে চায় বর্তমান আফগানিস্তান সমপযার্য়ের কোনো ভূখণ্ডে।

রাজনীতি ও ক্ষমতার পালাবদলের প্রেক্ষাপটে শ্রদ্ধেয় সম্পাদক যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জায়গা থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের একটি বড় রাজনৈতিক অংশ বা সাধারণ সমর্থকগোষ্ঠীকে কেবল প্রশাসনিক ঘোষণা বা বক্তব্যের মাধ্যমে মুছে ফেলা বাস্তবে সম্ভব নয়। বিশেষ করে সেই দলটিকে, যে দল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রেখেছে কৃতজ্ঞ থাকার মতো ভূমিকা। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এই দলটির ওপর নিষিদ্ধের খড়গ এই প্রথমবার নয়। ইতিহাস আরো সাক্ষী দেয়, জবরদস্তিমূলক অবস্থান রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেয় না। আজকের দম্ভোক্তি আগামীর জন্য হাস্যস্পদ হতে কতক্ষণ!

সম্পাদকের কলামে আতকে ওঠার মতো অবক্ষয় এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ চিত্র ফুটে উঠেছে মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও বলাৎকারের ঘটনাগুলোতে। কী মর্মান্তিকভাবেই না শিশুদের ওপর সংঘটিত হয়ে চলেছে যৌনসন্ত্রাস! কারা করছে সেগুলো? তাদেরই শিক্ষক নামের ঈমানদারেরা! সামাজিক লজ্জা কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার অজুহাতে এসব অপরাধ চেপে রাখা চরম অপরাধমূলক মানসিকতার জন্ম দেয়। অপরাধীকে তার অপরাধী পরিচয় বাদ দিয়ে ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ে আড়াল করার এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। এখানে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা অপরাধকেই প্রশ্রয় দেয়। উভয় পক্ষের গন্তব্য হওয়া উচিত কাঠগড়া। জান্নাতের লোভ দেখিয়ে কোন নরকে টেনে নেওয়া হচ্ছে বিপুলসংখ্যক শিশু আর আমাদের সমাজকে!

আন্তর্জাতিক চুক্তি ও দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। নির্বাচিত সরকার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী ও একপেশে কোনো অর্থনৈতিক বা সামরিক বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ হওয়া কতটুকু যৌক্তিক, সেই প্রশ্ন তোলাই যায়। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনার শর্ত কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কিছু নির্দিষ্ট দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা মেনে নেওয়া জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। আইরনি হলো, এই সংঘর্ষ এবং অশান্তির চিতা যিনি বাংলাদেশের বুকে জ্বালিয়েছেন, তিনি শান্তিতে নোবেল প্রাপ্ত একজন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের মর্মান্তিক ঘটনার পাশাপাশি হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে কয়েকশ শিশুর মৃত্যু আরও এক গভীর ট্র্যাজেডি। সেই গভীর যাতনায় আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের পথ ধরে সম্পাদকের কলম নীরবতা পালন করেনি। এই ঘটনা চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তীসময়ে ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলাকে স্পষ্ট করে। যে কোনো সরকারের আমলেই জনস্বাস্থ্যের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে স্বচ্ছতা ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে যদি কোনো নোবেল লরিয়েটকেও আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়, এবং সেই দায়িত্ব পালনে নির্বাচিত সরকার গড়িমসি দেখায়, তার জন্য নির্বাচিত সরকারও দায়বদ্ধ।

সম্পাদকীয়তে জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণহানির পরিসংখ্যান প্রকাশের প্রসঙ্গটি এসেছে। বিউটুন দ্য লাইনের ভাঁজে থাকা কটাক্ষটি বেশ! হাজার হাজার প্রাণক্ষয়ের কতশত বক্তব্য উজিয়ে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত তালিকা থেকে জানা যাচ্ছে মৃতের সংখ্যা ৮৪৩ এবং আহতের সংখ্যা ১৪,৩৭০। মানবসম্পদের এমন ক্ষয় নিঃসন্দেহে বেদনার। তবে বেদনার এই চিত্রটি সম্পূর্ণ নয়— এখানে অর্ধেক সত্য প্রকাশিত; বাকিটা অপ্রকাশিত। প্রকাশের সম্ভাবনা আদৌ রয়েছে কি না, সম্পাদকের অনুচ্চারিত প্রশ্ন এখানে ঘুরে ফিরে এসেছে। চব্বিশের অভ্যুত্থান পরবর্তী দেশে জঙ্গিদের বিপুল উদ্ভব ঘটে। দেশজুড়ে জঙ্গি তাণ্ডবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কখনও হয়তো জানা যাবে না। পুলিশ বাহিনীর বহু সদস্য হত্যা করা হয়েছে। লুট করা হয়েছে দেশজুড়ে থাকা থানাগুলোতে। লুণ্ঠিত অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধারের খবর আমরা জানি না। এই অজানা মনে শঙ্কা তৈরি করে। দেশময় বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ছড়িয়ে থাকা সমাজের নিরাপত্তার জন্য হুমকির সামিল। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কোনো দল নিষিদ্ধের আনন্দ-উল্লাস ছেড়ে এদিকে নজর দিলে ভালো করবেন। আমরা চাই পুলিশবাহিনীতে মানবসম্পদের যে ক্ষয় হয়েছে, সেইসব হত্যার সত্যনিষ্ঠ তালিকা প্রকাশসহ বিচার হোক। নিহত সাধারণ পুলিশ সদস্যদের হিসাব গোপন করা কিংবা তাদের প্রতি অন্যায় আচরণ দেখানো— এক যাত্রায় পৃথক ফল’এর দৃষ্টান্ত বৈ আর কিছু নয়।

ইতিহাসের চাকা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেবার সর্বশেষ সম্পাদকীয় বক্তব্যটি শুধু সত্যনিষ্ঠই নয় একই সঙ্গে বেদনা জাগানিয়া উপলব্ধিরও জন্ম দেয়। পঁচাত্তোর পরবর্তীসময়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিদের পালনপোষণের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা না পেলে বাংলাদেশের গন্তব্য আজ অন্য মাত্রার হতো। সেই হতে না পারা বাংলাদেশের জন্য হাহাকার জমা আছে সময়ের বুক পকেটে। সে পকেটে আরও ভারী কিছু বুঝি জমা হচ্ছে। উল্টো রথে চড়ে বাংলাদেশ আবারও অন্তহীন পথে যাত্রা করেছে, তার গন্তব্য কোথায়—জানা নেই। যারা বিগত আঠারো বছর ‘কুত্তার জীবন’ যাপন করেছিলেন বলে আক্ষেপ করতেন, তারা হয়তো বর্তমানে রাজার হালে আছেন। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ, তারা কেমন আছেন?

শেষমেশ এটুকুই বলা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ এবং রাজনীতিতে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্থান নিয়ে সম্পাদকীয়টিতে যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে, তা বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। ইতিহাসকে বিকৃত করা কিংবা স্বাধীনতাবিরোধী চেতনাকে প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থ দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করে তোলা। সব মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে, কোনো কাঠামোগত শিরোনাম ছাড়া অতি জরুরি কিছু ঘটনাপ্রবাহকে একটি একক আলোচনার সুতোয় বেঁধে লেখা সম্পাদকীয়টির আসল সুর এবং তার ভেতরের প্রশ্নগুলো, পাঠককের ভাবনায় আঁচড় কাটবে। এমুহূর্তে সেটা খুব জরুরি। জরুরি কাজের উৎসমুখ খুলে দেবার জন্য 'নিসর্গ'-এর সম্পাদকের প্রতি শ্রদ্ধা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

Prayers for Nepal

আলোহীন অন্ধকার