বাঁচি না কেন বাঁচার আনন্দেই...
আমরা প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে জীবনভর গাম্ভীর্যের এক নিরেট দুর্গ গড়ে তুলতেই যেন ব্যস্ত থাকি। কেননা, নিরন্তর সজাগ এই পৃথিবীর চোখে কোনোভাবেই আনাড়ি, অপ্রস্তুত বা তুচ্ছ প্রতিপন্ন হওয়ার লজ্জা আমাদের সয় না। আর সেই ভয় মেটাডরের মতো শিং উঁচিয়ে আমাদের তাড়া করে বেড়ায়। আমরা আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে শান দিই, মর্যাদাকে আঁকড়ে থাকি এবং প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত মেপেজুখে উচ্চারণ করি। ভাবখানা এমন, যেন এইধারা রক্ষা করা গেলে জীবনবাবাজির গলায় যাবতীয় বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে রক্ষাকবজের মাদুলি হয়ে জুটে যাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের শক্তি। অথচ, অবিরাম সংযত ও স্থির থাকার এই প্রচেষ্টায় আমরা প্রায়শই নিজেদের অহংকারের বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়ি। আমরা আড়ষ্টতাকে শক্তি এবং বিদ্রূপাত্মক মনোভাবকে প্রজ্ঞা বলে ভুল করি। অথচ ভুলে যাই, জেলবন্দি কয়েদির মতো বানোয়াট সেই নিয়ন্ত্রণ নামের মুখোশের আড়ালে কাটানো জীবন আদতে লাবণ্য, বিস্ময় এবং স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের স্বাদ থেকে বঞ্চিত এক নিরস জীবন।
এই ফাঁপা জীবনকে পাশ কটিয়ে বাঁচার আনন্দে বাঁচতে শেখার গুরুত্ব আ্যালডাস হ্যাক্সলির ভাবনা-চিন্তায় প্রকট। পান থেকে চুণ খসে পড়লেই জীবন হায় হায় করে হাত গ’লে গভীর কুয়োতে যে পতিত হয় না; সহজভাবে বাঁচতে জানাও একটা শিল্প, কত অনায়াসেই সে কথা তিনি বলেছেন। তাঁর কথায় কখন 'বোকা' সাজতে হয়, তা এক সূক্ষ্ম শিল্প। মাঝে মাঝে নিজের গুরুত্বের ওজনদার বর্মটি খুলে ফেলার মাঝে এক ধরণের প্রশান্তিময় মুক্তি লুকিয়ে থাকে। সঠিক সময়ে বোকা সাজাটা অজ্ঞতার পরিচয় নয়, বরং তা হলো সচেতন বিনয়—নিজেরই অদ্ভুত সব আচরণের ওপর হাসতে পারা, কোনো অমার্জিত বা সহজ-সরল প্রশ্ন করা, কিংবা বাইরের মানুষের চোখে কেমন দেখাবে—তা নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বিশুদ্ধ ও হিসাব-নিকাশহীন আনন্দের মুহূর্তে নিজেকে সঁপে দেওয়া। এটি এমন এক উপলব্ধি যা স্বীকার করে নেয় যে, আমাদের কঠিন-কঠোর মর্যাদাবোধ আসলে এক ভঙ্গুর ঢাল মাত্র, যা আমাদের প্রকৃত সত্তা প্রকাশের ভয়কে আড়াল করে রাখে।
যখন আমরা নিজেদের বোকা হওয়ার স্বাধীনতা দিই, তখন আমাদের সামনে পৃথিবীটা হঠাৎ করেই যেন অবারিত হয়ে যায়। আমরা কোনো নিশ্চয়তা ছাড়াই ভালোবাসতে শিখি, হতাশ না হয়ে ব্যর্থতাকে মেনে নিই এবং আমাদের বিচারপ্রবণ মন কোনো কিছুকে সংজ্ঞায়িত বা শ্রেণিভুক্ত করার আগেই অস্তিত্বের অকৃত্রিম সৌন্দর্যকে অনুভব করতে পারে। এই শিল্পের মূল কথা লাগামছাড়া বোকামি নয়, বরং এটা বোঝা যে কখন গাম্ভীর্য কোনো কাজের হাতিয়ার না হয়ে বরং একরকমের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বুঝতে পারা আমাদের সাহস জোগায়—তখন আমরা আমাদের চারপাশে তৈরি আত্মরক্ষার দেয়াল ভেঙে ফেলতে সক্ষম হই। লোকসমাজের বানোয়াট বিচারকের কাঠগড়া থেকে বেরিয়ে আসি এবং মানুষ হিসেবে জীবনের অগোছালো অথচ সুন্দর ও অদ্ভুত যাত্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে শামিল হই।
প্রকৃত প্রজ্ঞা মানে সব প্রশ্নের উত্তর জানা চাই, এমনটা নয়। বরং মাঝে মাঝে নিয়মকানুনের চোখ রাঙানি ভুলে গিয়ে প্রাণভরে বেঁচে থাকার মতো মুক্ত হৃদয়-মনের মালিক হওয়াটাই হলো আসল প্রজ্ঞা। দুরন্ত ঘূর্ণির পাক খাওয়া আপনার বানোয়াট গুরগম্ভীর দুনিয়ার সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রণে আছে, এমন এক বিভ্রমের ভেতর থাকতে গিয়ে নিজেকে আপনি আনন্দের কোনো মুহূর্ত থেকে বঞ্চিত করছেন না তো? ভেবে বলুন দেখি!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন