মাটির মূর্তি ভাঙা সহজ, ইতিহাস মোছাও কি?



ই ঘটনা জুলাই ২০২৬-এর; কোনো এক স্কুলের শিশু শ্রেণির ছেলেমেয়েদের দুহাজার চব্বিশের জুলাই-এ নিহত আবু সাঈদের ছবি আঁকতে বলা হয়েছিল। কতই বা বয়স ওদের! কে শহীদ, কে বীর, এসব বোঝার ক্ষমতা এই বয়সে ওদের ভেতর তৈরি হওয়ার কথা নয়। বোধটা যেন তৈরি হয় সেজন্য ওদের তৈরি করা প্রয়োজন বইকি। তৈরির এই ধাপ পরিবার এবং স্কুল, দুই স্থানেই হতে পারে। ইতিহাসের প্রতি সৎ থেকে দেশের জাতীয় বীরদের গল্প শিশুদের বলা জরুরি। ওদের ধারণক্ষমতা বুঝেই ইতিহাসের পাঠদান চলতে পারে। বলা যেতে পারে আমাদের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের গল্প। তাঁদের আত্মত্যাগ রূপকথা মনে হলেও তা যে একবিন্দুও বানোয়াট নয়, তার সত্যতা ইতিহাস ধারণ করে আছে। শিশু শ্রেণির শিশুরা এখনই সেসব বুঝবে না। কিন্তু ছোটবেলা থেকে যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, বীরশ্রেষ্ঠ এসব গল্পগুলো সহজবোধ্য করে শোনানো যায় তাতে করে শিশুমনে দেশের জন্য জীবন দেওয়া বীরদের প্রতি যেমন শ্রদ্ধা-মমতা তৈরি হবে; পাশাপাশি ইতিহাসকে গুরুত্ব দেবার প্রবণতার বীজটিও পুঁতে দেওয়া সম্ভব হবে। ইতিহাস বিমুখ জাতি হালহীন নৌকার মতো লক্ষ্যহীন গন্তব্যের যাত্রী। ইতিহাসবিমুখতা আমাদের আগামীর কাণ্ডারী হোক সেটা নিশ্চয়ই আমরা চাইবো না। শিশুমনে ইতিহাসের প্রতি মমতা তৈরির বিষযটা যেন জোর-জবরদস্তি হয়ে না যায়, সেদিকেও সযত্ন নজরও থাকা চাই।

দলীয় তেলবাজি না করে যা সত্যি, সেটাকেই তুলে ধরা দরকার। ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দ সেখানে যেন থাবা বসাতে না পারে। বিগত সময়গুলোতে যেমন ঘটে এসেছে, ক্ষমতাসীনদের খুশি করতে একশ্রেণির মানুষ সদা প্রস্তুত ইউনিটের হয়ে চব্বিশঘণ্টাই যেন প্রস্তুত ছিল। এই অতিরিক্ততা ইতিহাসের সর্বনাশ ঘটায়– এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ অতীতে তৈরি হয়েছে। ২০২৪ এর জুলাই আন্দোলন ঘিরে সুশাসনের নতুন ভোর, শক্তিশালী গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা ইত্যাদি তৎকালীন সরকার উৎখাতে যা যা বলা হয়েছিল সেগুলোর কণামাত্রও কী এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়েছে? যেহেতু দেশ থেকে দূরে আছি, আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। যারা দেশে থাকেন তারা ভালো বলতে পারবেন। বিগত আঠারো বছর যারা ‘কুকুরের জীবন’ যাপন করেছিলেন তারা রাজার হালে না হোক, অন্তত মানুষের হালে থাকছেন, এ খবরটিও যথেষ্ট স্বস্তির 'নতুন যাত্রা করা বাংলাদেশের' জন্য।

শুরু করেছিলাম জুলাইয়ে নিহত শিবিরকর্মী আবু সাঈদের ছবি আঁকার গল্প নিয়ে। শিশুদের দিয়ে ছবি আঁকালেই দুই হাজার চব্বিশের জুলাই মহিমান্বিত হয়ে যাবে বলে কেন মনে হলো? কাদের ভাবনা এটি? ওই স্কুলের ছেলেমেয়েরা কী সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের ছবি এঁকেছিল আগে? যদি এঁকে থাকে, তবে হয়তো শিশুমনে বিভ্রান্তি দানা বাঁধবে—এই জনটি কে! সত্যিই তো, কে তিনি? হাদী নামের আরেকজন রয়েছেন, মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষমতাকালে যাকে হত্যা করা হয়েছে– শুনতে পাই তিনিও না কি এক জাতের বীর। তার বীরত্বের ইতিহাস আমার মতো অনেকেরই হয়তো জানা নেই। এসব ইতিহাস না জানা খুব ক্ষতির তাও নয়। কাদের ইতিহাস না জানা ক্ষতির? কৃঘ্নতার? অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের বীরদের নাম না জানা, তাঁদের বীরত্বের ইতিহাস না জানা এবং না জানানো, শুধু শিশুদের জন্য নয়, প্রতিটি স্কুল-পরিবারের জন্য লজ্জার, ধিক্কারযোগ্য অপরাধ বলে মনে করি। বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধের ইতিহাসে যাঁর যে ভূমিকা, সে আপনি(জামাত ভিন্ন) যে দলের প্রতিই সমর্থন দিয়ে থাকেন না কেন—দলমতের উর্ধ্বে উঠেই তাঁকে-তাঁদের মূল্যায়ণ করতে হবে। তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। ‌এবং এই মানসিকতা শিশু বয়স থেকে তৈরিতে যত্নশীল থাকতে হবে।

ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে আমি কিংবা আপনি, শেখ মুজিবুর রহমানকে পছন্দ নাই করতে পারি। তাতে কিন্তু ইতিহাসের কিছুই যায় আসে না। ইতিহাস তার পাতায় সেই সময়কার ইতিবৃত্ত সযত্নে ধরে রেখেছে, লেখা আছে এই মানুষটির কর্মযজ্ঞের হিসাব-নিকাশ। অযুত-নিযুত মাটির মূর্তি ভাঙলেও বাংলাদেশ সৃষ্টিতে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান না যাবে মুছে ফেলা, না যাবে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া। একই কথা সাতবীর শ্রেষ্ঠের ক্ষেত্রেও সত্যি। সত্যি ত্রিশলক্ষ শহীদ আর অযুত-নিযুত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রেও।

এই সত্যি যে পারিবারিক আবহে নিরন্তর ঘুরপাক খায়, সেই পরিবেশে বেড়ে ওঠা কোনো শিশু তাকে যা আঁকতে বলা হয়েছে তার পরিবর্তে, স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে যদি তার মনে সেঁটে থাকা বাংলামায়ের অগ্রগণ্য বীর সন্তানটির ছবি এঁকে বসে, তাকে কি আপনি শাস্তি দেবেন! দেওয়া উচিত?? স্কুল থেকে জুলাইয়ে নিহত সাঈদের ছবি আঁকতে বলা হলেও শিশু শ্রেণির এক ছাত্র কার ছবি এঁকেছেন বলুন দেখি? তর্জনী উচিয়ে ভাষণরত এক দীর্ঘদেহীর অবয়ব এঁকেছে সে যত্ন করে। শিশুটিকে হয়তো ওর বাবা-মা কিংবা দাদি-দাদা বা নানা-নানু অথবা অন্য কেউ গল্পে গল্পে শুনিয়ে থাকবেন একাত্তরের কথা, সাহসী তর্জনীর গল্প!

স্যোশাল মাধ্যমে মৃত সাঈদের ছবির বদলে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি আঁকার পোস্ট দেখে বুকের ভেতর মন কেমনেরা এমন শোরগোল তুলেছিল! চারিদিকে ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দেবার এই মৌষলকালে ছোট্ট এক শিশুর সযত্নে আঁকা একটি ছবি মনে অনেকটা আশা হয়ে জ্বলে ওঠে।

মুছে ফেলার শত চেষ্টা উজিয়ে সময় তার বুকপকেটে সযত্নে আগলে রাখছে আহমদ ছফার সত্যবচন: "আজ থেকে অনেক দিন পরে হয়তো কোনো পিতা তার শিশু পুত্রকে বলবেন জানো, খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলো যার দৃঢ়তা ছিলো, তেজ ছিলো আর ছিলো অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিলো, ভালোবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্না রাতে রূপোলি কিরণ ধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তা বোঁধ জাগিয়ে তোলে তা হলো তার ভালবাসা। জানো খোকা তার নাম? শেখ মুজিবুর রহমান"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

শান্তির ছদ্মবেশে কি স্বাধীনতাহরণ?

বড় বেদনার মতো বাজে...

'বুড়ো শালিকের ঘোড়ে রোঁ'