দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক
ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত তৈরি হয়, যখন রাষ্ট্রের আইন আর মানুষের বিবেক একে অপরের বিপরীতে দাঁড়ায়। Netflix-এর ‘23,000 Lives’ সেই সংঘাতেরই এক জীবন্ত দলিল। এখানে কিছু তরুণ সমুদ্রের দিকে ছুটে যায় শুধু এই বিশ্বাস নিয়ে যে মানুষের জীবন বাঁচানো কোনো রাজনৈতিক অপরাধ নয়, বরং মানবিকতার দিক থেকে এটি তার মৌলিক দায়িত্ব। জার্মানির কিছু দরদী তরুণ মিলে ২০১৬’র দিকে তৈরি করে Jugend Rettet নামে একটি ছোট্ট NGO, যার লক্ষ্য ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মুখ থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের উদ্ধার করা। এই উদ্যোগে তারা কোনো সরকারি প্রশিক্ষণ পায়নি, কোনো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও জোটেনি। শেষমেশ ক্রাউড-ফান্ডের অর্থে তাদের উদ্ধার অভিযান শুরু হয়; যার আওতায় একটি ব্যবহৃত মাছ ধরার জাহাজ কিনে ভূমধ্যসাগরে নিয়ে যাওয়া হয় যাতে ডুবন্ত প্রায় শরণার্থীদের পানি থেকে উদ্ধার করা যায়। লুকাস এবং তার দলের প্রধান কাজ ছিল যে মানুষগুলো বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে ডিঙ্গিতে চড়ে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে, তাদের নিরাপদে তুলে আনা।
কিন্তু তাদের এই কাজই রাষ্ট্রের চোখে হয়ে ওঠে অপরাধ। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তার সার্বভৌমত্বকে এতটাই মূল্যবান মনে করে যে মানুষের জীবন কখনো কখনো সেই সার্বভৌমত্বের নিচে চাপা পড়লেও তাতে কিছু যায় আসে না। অথচ, সময় বিশেষে এই রাষ্ট্রগুলোই ‘সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপর নাই’ বিশ্বাসহীন এমন ফাঁপা বুলিতে উচ্চকণ্ঠ হয়। তাই সীমান্ত রক্ষা করা এসব রাষ্ট্রের কাছে হয়ে ওঠে মানুষের জীবন রক্ষার চেয়েও বড় দায়িত্ব। ফলে অভিবাসন সংকটকে নিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত করা হয়, আর মানবতার কাজকে দেখা হয় রাজনৈতিক বিদ্রোহ হিসেবে। দরদী লুকাস এবং তার দল প্রথমদিকে শত শত মানুষকে উদ্ধার করে। কী গভীর মমতায় তারা জীবনের তাগিদে হাজার মাইল উজিয়ে আসা শিশুকে কোলে নেয়, আহতদের সেবা করে, পানির বোতল দেয়, জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট বিলায়। সেই মুহূর্তগুলোতে মনুষ্যত্ব রাষ্ট্রের চেয়ে অনেকগুণ বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপে বাড়তে থাকে অভিবাসীবিরোধী মনোভাব। রাষ্ট্রের নীতিমালা কঠোর হয়, যুথবদ্ধ তরুণদের কাজকে দেখা হয় সীমান্ত নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ষড়যন্ত্র হিসেবে। ফলে Jugend Rettet-এর জাহাজ Iuventa–কে আটক করে ইতালি। তাদের বিরুদ্ধে আনা হয় মানবপাচারের অভিযোগ। শুধু তাই নয়, প্রতিটি উদ্ধারকৃত মানুষের জন্য ১৫,০০০ ইউরো জরিমানার হুমকি দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের আইন যখন মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তার নৈতিকতা নামের চোখ অন্ধ হয়ে যায়, তার ক্ষমতা মাথাচাড়া দেয় ভয়ানক নিষ্ঠুরতায়। ‘23000 lives’- চলচ্চিত্রটি এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার জীবন্ত এক উদাহরণ।
পৃথিবী জুড়ে সক্ষম-ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের এই নিষ্ঠুরতার ভেতরে আছে আরও গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতা। আজকের দিনে অভিবাসন শুধু আর মানবিক সংকট নয়; এটি রাজনৈতিক দলগুলোর হাতিয়ার। ভয়, ঘৃণা, এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে জনমত নিয়ন্ত্রণ করা এখন অনেক রাষ্ট্রের পরিচিত কৌশল। অভিবাসীকে “অন্য” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেন তাদের জীবন রক্ষা করা কোনো নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে হুমকি। ফলে অসহায় মানুষের জীবন যাদের কাছে সর্বাগ্রে মূল্য পায়, সেরকম সংগঠনগুলোকে অপরাধী বানানো হয়, তদন্ত ও মামলার মাধ্যমে তাদের নৈতিক সাহসকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা চলে। রাষ্ট্রের প্রদর্শিত এই ক্ষমতা, আইন, মামলা, তদন্ত ইত্যাদি মানবতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়ে তা হয়ে ওঠে নৈতিক দেউলিয়াপনার চিহ্ন। যে চিহ্ন রাষ্ট্রের কপালে খোদাই হলেও যেন কিছু যায় আসে না। সীমান্ত রক্ষা, সংশ্লিষ্ট দেশের জনগণের নিরাপত্তার নামে নিজের নিজের ক্ষমতার দম্ভ-জেদকে তো রক্ষা কবজ পরানো গেল!
আজকের পৃথিবীতে যখন অভিবাসী মানেই নিরাপত্তার ঝুঁকি, অন্য ভূখণ্ড পাড়ি দিয়ে আসা মানুষগুলোকে অপরাধী, বা মানুষ নয় বরং স্রেফ ‘অন্য’ হিসেবে দাগিয়ে দেবার প্রবণতা তীব্র হচ্ছে; তখন 23,000 Lives–এর মতো সিনেমা প্রয়োজন। অস্বীকারের উপায় নেই, আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর ভেতর অনেকেই অপরাধমূলক কাজে জড়িত হয়, যা কি না আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়। তাছাড়া আগত আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা মাত্রারিক্ত হওয়াটাও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করে, তারপরও যে রাষ্ট্রগুলোর আশ্রয় দেবার সক্ষমতা রয়েছে তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় হতভাগ্য মানুষেরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! এই আন্তরিক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই লুকাসদের মতো তরুণেরা সমুদ্রে ভাসমান হতভাগ্য মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে চায়। সত্যি ঘটনার ওপর নির্মিত এই সিনেমা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কেউ অতটা মরিয়া না হলে অনিশ্চিত সমুদ্রপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। দুধের শিশুকে নিয়ে কেউ ছোট্ট ডিঙ্গিতে ওঠে না যদি না তার স্বদেশের মাটি, জীবন ফুরানোর আগেভাগেই তার জন্য কবর খুঁড়তে প্রস্তত না হয়। হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী আজ, বুকের ভেতর মমতার আলো জ্বালিয়ে খুব কম মানুষই মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছুক— এরকম এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নিজের পারিবারিক সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে পায়ে ঠেলে অন্যকে বাঁচাতে আগুয়ান Jugend Rettet-এর তরুণেরা মঙ্গল বারতার যে জয়গান গায় তার আলো ছড়িয়ে পড়ে তোমার আমার— আমাদের প্রাণে। এক মানুষের পাশে অন্য মানুষের দরদী হয়ে দাঁড়িয়ে যাবার এই মমতা, জেগে থাকুক। পৃথিবীটা এমন সবুজপ্রাণ মানুষে ভরে উঠুক, যাঁরা হিংসা-বিদ্বেষের অন্ধকার সরিয়ে আলো-আগুনের প্রতীক। যারা ধ্বংস নয় সৃষ্টি সুখের উল্লাস বুকে পুরে বাঁচায়-বাঁচাতে চায়– যারা রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতার সামনে দাঁড়ায় নৈতিক সাহস নিয়ে।
সিনেমাটি আগাগোড়া নিখুঁত এমনটা বলা যাবে না। প্রায় দু’ঘন্টার এই সিনেমায় কিছু চরিত্রের অগোছালো আবেগপ্রবণতা দেখা গেছে, কোথাও কোথাও একপেশে মনে হয়েছে, কোথাও বা কিছু চরিত্র সরলীকৃত হয়ে উপস্থিত হয়েছে। এরকম স্পর্শকাতর বিষয়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যদিও কঠিনসাধ্য, তবে অসম্ভব নয়। সুরকার ভলকার বারটেলম্যান এবং প্রোডাকশন ডিজাইনার ক্রিশ্চিয়ান গোল্ডবেক, এঁরা দুজনই অস্কারজয়ী। ‘23000 lives’তেও তাঁরা তাঁদের কাজের পরিশীলিত রূপ দেখিয়েছেন, যা যথাযথ মনে হয়ে। শেষটায় যেন কিছুটা তাড়াহুড়ো হয়ে গেছে। এসব সত্ত্বেও এটি একটি জরুরি সিনেমা।
‘23000 lives’ বুঝি আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় যা সক্ষম-ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলো এড়িয়ে যেতে চায়। মানুষকে বাঁচানো কি অপরাধ? কিংবা রাষ্ট্রের আইন কি মানবতার চেয়েও বড় বা গুরুত্বপূর্ণ? এটি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় নৈতিক প্রশ্ন। যার মানবিক উত্তরে নির্ভার হয়ে মঙ্গলময় এক পৃথিবী বুক ভরে নিশ্বাস নেবে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন