শোকার্ত তুরাগের পাড়ে গেয়ে যায় দারবিশের বাউল
তুরাগ হয়তো ভবিষ্যতেও বয়ে যাবে। সময়ের দাগ কামড় বসাবে শরীরে। ওর জলের অতলে লুকানো জলের দাগ! জল না কি রক্ত? সন্তর্পণে সাক্ষী দিয়ে যাবে নামহীন অসংখ্য মৃত্যুর। একদিন কি তাকে কহর দরিয়া নামে ডাকা হবে! কষ্টচাপা নদী, যার প্রতিটি ঢেউয়ের নিভৃত ভাঁজে থাকে কষ্টের গোপন দলিল, তাকে তো এমন নামই সাজে!
নদীকে যখন জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করা হলো, আমরা ধরে নিলাম বুঝি তাকে মানুষের মতো অধিকার দিলাম, অথচ মানুষের অধিকার মানুষের কাছেই আর রইল না।
ফেব্রুয়ারির বাতাসে প্রথম রক্তের গন্ধ, মার্চে তালিকা, এপ্রিলের বৈশাখে হাসপাতালের শীতল বিছানা, মে মাসে ফ্লাইওভারের নিচে ঝুলে থাকা শরীর—সবই যেন তুরাগের বুকের ওপর একটি করে দাগ হয়ে জমা রইল। ভোল বদলে পারদর্শী মানুষের কাণ্ড যেমন সে দেখেছে, একই মুদ্রার নির্লিপ্তি নিয়ে দেখেছে লাশের ভাসান।
মায়ের শরীর ভেঙে পড়েছিল মৃত ছেলের ওপর, জন্মদিনের কেকের মোমবাতি নিভে গিয়েছিল রডের আঘাতে, জেলখানার দেয়াল গিলে ফেলেছিল অসংখ্য শ্বাস। তুরাগ দম আটকে শুনেছে কেবল সে আর্তনাদ, অসহায়ত্ব নিয়ে চোখ বুঁজে ফেলেছিল বুঝি জান্তব জিঘাংসার হলিখেলায়। ওর বেয়াড়া কিছু ঢেউ নিষেধের আজ্ঞা ভুলে অস্ফুটে বলে ওঠেছে ‘আমি-আমরা দেখেছি।’ বাতাসের ঘূর্ণি সেসব অস্ফুট বিড়বিড় জড়ো করে নিয়ে গেছে ধোলাইখালে; অসংখ্য অস্ফুট সংলাপ যেখানে প্রতিরাতে সভা করে। ইতিহাসকে সাক্ষী মানে, কখনো কখনো তার বরাবরে চিঠি লিখে। চিঠি জুড়ে কেবলি হত্যা, ফেরারি স্বজনের খোঁজ চেয়ে আকুতি। ইতিহাসের ওসব প্রাপ্তি খুব নতুন তো নয়; অজস্র সুপারিশে সুপারিশে তার ভাঁড়ার উপচে পড়েছে বিগত দিনেও। ইদানীং সেসবের মাত্রা রেকর্ড ভেঙেছে—ভাঙছে, প্রতিদিন। কাঁচা রক্তের ছোপ লেগে থাকা চিঠি কিংবা নিখোঁজের সন্ধানে করা আর্তির ভার বইতে তারও বড় ক্লান্ত লাগে…
নদীর পথ ধরে, আমরাও চুপ থাকি বিলকুল। সময়কে লেখার দায় ভুলে বিশ্বকাপে বুঁদ হই। মেসি কিংবা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তর্ক ডোপামিন হয়ে আমাদের উজ্জ্বীবিত রাখে আগামী তর্কের মঞ্চ মাতানোর জন্য। ওদিকে অপঘাতে মৃতের সারি বেড়ে চলে অলক্ষ্যে। তুরাগের বেয়াড়া ঢেউয়েরা হয়তো হিসেব টুকে রাখছে, লিখে রাখছে তাদের নাম, যারা নীরবতা ভেঙে কণ্ঠ তুলেছিল বাঙালির প্রাণের স্লোগান… !
নদীটার নাম তুরাগ। একটা দেশের বুক চিরে সে বয়ে যায়। মুখে তার শব্দ ফোটে না। তার জলের অতল খুঁড়লে পাওয়া যাবে সেই তাদের, যাদের হৃৎপিণ্ড আঁকড়ে আছে সেই দেশ, যেদেশটার লাল-সবুজ আঁচলের গিঁটে বাঁধা ৭মার্চ, একটা অজেয় তর্জনী, এক অজর মন্ত্র আর সনদের চার নীতি!
ও মানুষ, প্রকৃতির খেলা যে বড় বিচিত্র! যদি একদিন তেমন হয়: সব নীরবতা ঠেলে, শান্তিময়তার গুমোর ফাঁস করে দেয়, আজকের নিশ্চুপ তুরাগ! যদি জল ঠেলে অতল থেকে তুলে আনে একটা সময়ের রক্তাক্ত সত্যি? সেদিনও কি তুমি অভিশাপের দায় নিয়ে নীরবই থেকে যাবে?
মাহমুদ দারবিশের ‘অ্যা লিটিল ইভনিং’ ফের মগজে ঘাই দিয়ে যায়। দূরে, তুরাগের পাড়ে কোনো এক বাউল বুঝি গান গেয়ে যায়… যার পাঁজর খুঁড়ে পাওয়া যায় হৃদয়, হৃদয় খুঁড়তেই—অযুত মুখের ভিড়, তার দেশের মানুষ! কণ্ঠ চিরে তন্ন তন্ন খোঁজা হয়, সেখানে ঘন বিষাদে থইথই। বিষাদ পেরিয়ে মাথা তোলে কারাগারের অন্ধ কুঠুরি। তল্লাশি থামে না তাও; শেষমেশ নিজেদের যুথবদ্ধ ছায়াদের দেখতে পাওয়া যায় কারাগারের শিকলে বন্দি!
ছবি: এ.আই.

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন