ইডি নিউম্যানের সঙ্গে কথোপকথন



সাক্ষাৎকার বুঝি আত্মপ্রকাশের একটা দরজা খুলে দেবার মতো ব্যাপার। দুজন(কখনো কখনো দুইয়ের অধিক) মানুষের কথোপকথনে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে উঠে আসে অনেক কথা, স্মৃতি আর গল্পের বীজ। এতদিন সাক্ষাৎকারগ্রহীতা হিসেবে বেশ কয়েকজন সাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। তাঁদের সবাই লেখালিখির ক্ষেত্রে উজ্জ্বল এবং বিস্ময় জাগানোর মতো রয়েছে তাঁদের ভক্তপাঠক। তার কিস্যুই নাহার তৃণার নেই। সংগ্রহের যে ব্যাপক বিশাল আগ্রহ আছে তাও নয়। গতবছর পর্যন্ত সাহিত্যে নোবেলখানা কোন উপায়ে বগলদাবা করা যায়, সেটি নিয়ে ভাবতেম। নোবেলপ্রাপ্তি নিয়ে কোনো এক ভিনদেশি সাহিত্যিকের মতামত জানার পর ‘নাআআ এ হতে পারে না’ বলে সেস্বপ্ন ভাসান দিয়েছি। মাথা খারাপ নাকি! কাড়ি কাড়ি সাক্ষাৎকার দেওয়া লাগবে। আজ এই অনুষ্ঠানে যাও, কাল ওইখানে গিয়ে বলো: যখন ফোনটি এলো, আমি তখন আনন্দ নাড়ুতে সবেমাত্র কামড় বসিয়েছি! প্রশ্নকর্তা চোখ মটকে হয়তো বলতে চাইবেন, আরে না, না, ওই ফোন আপনাকে যখন করা হবে তখন হয়তো ওখানে গভীর রাত… তো? যার রাত জাগার অভ্যেস, সে না ঘুমিয়ে নাড়ু খেতে পারে না? যুক্তির মুখে চুনকালি! মোদ্দাকথা, সাক্ষাৎকারের নামে একঘর লোকের সামনে লেখালিখি নিয়ে বলতে হবে, ভাবতেই তো চোখে টিউলিপের বাগান দেখার কথা, যেখানে ঘুরে ঘুরে দুজন মানুষ গাইছে ‘দেখা এক খাব্ তো ইয়ে সিলসিলে হুএ’। ও আমার কম্মো নয় বাপু। নোবেলকে তাই দিয়েছি জলাঞ্জলি। হাতে থাকলো পেন্সিল। পেন্সিলে জীবন আঁকছি নিজের মতো করে, নীরবে। সে জীবন যেসব বানোয়াট গল্প লিখে, তা প্রকাশের আনন্দেই লিখে। কিছু পাঠক হয়তো পড়েন, তারা কোন অলিন্দ-নিলয়ের বাসিন্দা তার নাড়ী-নক্ষত্র খোঁজার চেয়ে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারাটাই আমার আনন্দ। পরিচয়ের আকুতি না থাকলেও অজানা পাঠকদের প্রতি সকৃতজ্ঞ ভালোবাসা জানাতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য কখনো দেখাইনি– জানিয়ে রাখলেম।

সাক্ষাৎকার লেখক-পাঠকের মধ্যে একটা অদৃশ্য সেতু তৈরি করে। সাহিত্য আলাপের ফাঁক-ফোঁকরে লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি বা পছন্দ অপছন্দের নানা কথাই উঠে আসে। সত্যি বলতে কী বাংলাভাষার সাহিত্যে অনেকটা সময় জুড়ে থাকলেও সাক্ষাৎকার নেবার মতো যোগ্যতা লেখক হিসেবে অর্জন করেছি, সেটা আমার কখনো মনে হয়নি। গল্পপাঠের এডিটর ইন চিফ, একবার কারো একটা সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে নাহার তৃণার সাক্ষাৎকারের প্রস্তাব রেখেছিলেন বটে, বিনয়ের সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবটা এড়িয়ে গেছি।

কিন্তু শেষ রক্ষা হলো কই! ইডি নিউম্যানের সঙ্গে আমার পরিচয় খুবই অল্প দিনের। লিও তলস্তয়ের সঙ্গে তাঁর একটা কাল্পনিক সাক্ষাৎকারের সূত্রে। তাঁর সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদের জন্য অনুমতি চেয়ে তাঁকে পত্রবাণ করি। তিনি সানন্দে অনুমতি দেন। এর মধ্যে মাস দুয়েক পেরিয়ে যায়। তলে তলে তিনি যে ভিনদেশি এক ঢ্যাপের খই, নাহার তৃণার আতাপাতার সন্ধানে নেমেছেন এবং তার লেখাজোখা পড়ে চলেছেন, সেবৃত্তান্ত আমার জানা ছিল না। গল্পপাঠের ৯৮তম সংখ্যায় তাঁর সাক্ষাৎকারের লিংক পাঠানোর পর সেটা দেখে তিনি দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

গল্পপাঠ টিমের জন্য অনেক শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি নাহার তৃণাকে নিয়ে তাঁর কিছু চিন্তা ভাবনার জন্ম হয়েছে সে কথা জানান। খাইছে! বলে চুপচাপ থাকি। এরপর এক ভিনদেশি পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়া ভেসে আসে ই-মেইলে। তিনি নাহারের অমুক গল্প পড়েছেন এবং সেটা তাঁকে যথেষ্ট শিহরিত করেছে। গল্পের ঘটনা তাঁর পুয়ের্তো রিকো এবং ম্যাক্সিকোর অনাথ আশ্রমে কাজের স্মৃতিকে জ্যান্ত করেছে। আমাজনের ফ্লিটিং ইম্প্রেসন বইটির গল্প তিনি প্রতিরাতে একটা-দুটো করে পড়ছেন। তার কিছু কিছু রিলেট করছে তাঁর স্মৃতি-অভিজ্ঞতার সঙ্গে। দৃষ্টিহীন কবি Charlene Groves এবং নিজের লেখা কবিতার কথা মনে পড়েছে নাহারের একটি গল্প পড়ে। লেখক হিসেবে, এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা-সংস্কৃতির একজন অখ্যাত লেখকের লেখা পড়ে একজন অগ্রজ আমেরিকান লেখক-সাক্ষাৎকারগ্রহীতা-কবি’র আন্তরিক উচ্ছ্বাসে স্বাভাবিকভাবেই ভীষণই আপ্লুত হয়েছি। যেকারণে তিনি যখন আমার সাক্ষাৎকার নিতে চান জানালেন, তখন আমি আকাশ থেকে কোথায় গিয়ে যে পড়েছিলেম সে আর মনে নেই! কী খেয়ে এবং কেন আমার সাক্ষাৎকার! যিনি kurt vonnegut সহ প্রচুর লেখক/কবি অন্যান্যদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, তাঁর কেন নাহার তৃণার সাক্ষাৎকার নেবার ইচ্ছে হলো!

একেই বাঙালি তার ওপর পাপী মন। সে মন প্রশ্ন করে বসলো ‘ইহা গিভ অ্যান্ড টেক’ নয় তো? যেহেতু আমি তাঁর একটা সাক্ষাৎকার অনুবাদ করেছি সেই কৃতজ্ঞতা থেকে তিনি এমন চিন্তা করেননি তো? হেনতেন বুঝিয়েও লাভ হয়নি। তিনি এমন অনায়াসে আমার সম্মতি আদায় করে নেন- যা সাক্ষাৎকার পর্বটা শেষ হওয়ার পরও আমাকে ভাবাচ্ছে। কীভাবে চট করে রাজি হয়ে গেলাম! কিছু মানুষ সম্ভবত জাদু জানেন, আমার ধারণা ইডি নিউম্যান তাঁদেরই একজন। আমার লেখক জীবনের প্রথম সাক্ষাৎকার এবং সেটা আমার মাতৃভাষায় নয়, এই খেদটুকু ছাড়া, ইডি নিউম্যানের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে মন খুলে আমি বক বক করেছি। তিনি সযত্নে তাঁর ব্লগে দুটো পর্বে সেটা প্রকাশ করেছেন। লেখক হিসেবে হয়তো এটাই আমার প্রথম এবং শেষ সাক্ষাৎকার। লেখক নাহার তৃণার ‘প্রথমে’র ইতিহাসে ভিনভাষী-অচেনা ইডি নিউম্যান জুড়ে গেলেন চিরতরে। তাঁর প্রতি সকৃতজ্ঞ ভালোবাসা।

সাক্ষাৎকারের লিংক:


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাদ যাবে কি মুজিব(বাদ!)?

শান্তির ছদ্মবেশে কি স্বাধীনতাহরণ?

বড় বেদনার মতো বাজে...