নব্বই মিনিটের যুদ্ধ এবং আড়ালে থাকা রাজনীতি-মানচিত্র
হইহই করে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলছে। মাঠের ফুটবল গড়িয়ে হাটে-ঘাটে, অলিতে-গলিতে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। বাড়ির যে মানুষগুলোকে পেটের জন্য অফিসে উপস্থিতি দেখাতে হচ্ছে, তারা অফিসে যাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে রয়েছে টিভির সূচিতে, ফুটবল মাঠে। ছেলে-বুড়ো সবাই বুঁদ হয়ে আছেন এখন ফুটবল-ফুটবল শোরগোলে। আয়োজক তিনটি দেশে চলছে ২০২৬ এর বিশ্বকাপ ফুটবল। আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ স্টেডিয়ামগুলোর টিকিট ও মাঠের ভেতরের আনুষঙ্গিক খরচ এবং খেলা দেখার সামগ্রিক আয়োজন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। মাঠে বসে দেখার জন্য যে টিকিট, তার দাম আকাশছোঁয়া; সে তুলনায় পয়সা দিয়ে হলেও ঘরে বসে খেলা দেখা মন্দ নয়। বাজার অর্থনীতির মাথায় আগুন লেগেছে, তাই আয়োজক দেশে খেলা দেখার জন্য অনেককে কাঁড়ি কাঁড়ি পয়সা গুণে তবেই নিশ্চিত হচ্ছে বিশ্বকাপ উপভোগের আনন্দ।
২০২৬ বিশ্বকাপের দলসংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮টি দেশ করা হয়েছে। নতুন যোগ দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চারটি হলো: কেপ ভার্দে, কুরাসাও (সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে ইতিহাস গড়েছে), জর্ডান, উজবেকিস্তান। ফুটবলের মাঠে একেবারেই অপরিচিত নতুন দেশগুলোকে নিয়ে হাসাহাসি কম চলছে না। প্রত্যুত্তরে নবীন খেলুড়ে দেশগুলো দর্শকমনে ভালোই বিস্ময় জাগাচ্ছে। নতুন যুক্ত দেশগুলোর পাশাপাশি ফুটবলের ইতিহাসে সমীহ জাগাতে সমর্থ, অনেকগুলো ভালো দল বাছাই পর্বে নিজেদের প্রমাণ করতে না পারায় বাদ পড়েছে। তাদের ভক্তদের জন্য নিশ্চিতভাবেই সেটা হতাশার। বাদ পড়া দলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ইতালি, নাইজেরিয়া, গ্রিস, চীন। রাজনৈতিক কারণে রাশিয়ার ওপর এখনো নিষেধাজ্ঞা বহাল আছে (ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালে ফিফা ও উয়েফা রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে)। ফলে রাশিয়া এবারও বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে।
এই যে এত এত দল বিশ্বকাপে খেলতে এসেছে, তার মধ্যে কিছু দল বিশ্বকাপে নামছে ট্রফির স্বপ্ন নিয়ে, আর কিছু দল নামছে বুকের ভেতর জমে থাকা ইতিহাসের ভার নিয়ে। ফুটবল কখনোই শুধুমাত্র কিছু ছক বা ইকুয়েশন আর অঙ্ক নয়—কিছু সময় ফুটবল হয়ে ওঠে মানুষের ক্ষত, জেদ, আর বেঁচে থাকার ভাষা। এই ভাষা শুধুমাত্র আনন্দের সুর তোলে না, তার সঙ্গে রাজনৈতিক তিক্ততা মিলেমিশে বিষাক্ত বাতাবরণও তৈরি করে। তাই খেলার সঙ্গে রাজনীতি না মেশানোর বয়ান সর্বৈব ভুলই শুধু নয়, একে স্বীকার করতে না পারাটা একরকমের প্রতারণাও। ২০২৬-এর বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দল ইরান সেই বিষাক্ত বাতাবরণের বৃত্তে দাঁড়িয়ে ফুটবলের লড়াইয়ে নেমেছে। ইরান দলটি যে শুধু খেলতে এসেছে তা যেন নয়, মনে হয় তারা এসেছে নিজেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে। ইরান সেই দেশগুলোর একটি, যার প্রতিটি ম্যাচের ভেতর লুকিয়ে আছে যুদ্ধের ক্ষত, নিষেধাজ্ঞার চাপ, ভাঙা স্বপ্নের দীর্ঘশ্বাস, তা সত্ত্বেও ওদের আছে বেঁচে থাকার অদম্য এক দীপ্তি। মাঠের ইরানকে দেখলে মনে হয় না যে সে এগারো জন খেলোয়াড় নিয়ে দৌড়াচ্ছে; মনে হয় একটি জাতি নব্বই মিনিটের জন্য পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে গেছে, তারা ঘোষণা করছে—“আমরা এখনো আছি।”
ইরানের গল্প ফুটবলের গল্প নয় শুধু—এটা আট বছরের যুদ্ধের গল্প, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার গল্প, মুদ্রাস্ফীতির গল্প, বেকারত্বের গল্প, বারবার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার গল্প। এটা সেই কোটি মানুষের গল্প, যারা সকালে কাজে যায়, রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরে ছেলেমেয়ের সঙ্গে বসে ফুটবল দেখে। জীবনের প্রায় কিছুই যখন নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না, তখন মানুষ অন্তত একটা স্বপ্নে বিশ্বাস করতে চায়। নব্বই মিনিটে অলৌকিক কিছু ঘটবে—এই বিশ্বাসই হয়তো তাদের বাঁচিয়ে রাখে। বেঁচে থাকার ইচ্ছে মরে গেলেও, জিতে যাওয়ার আশা মরে না।
ফুটবল প্রিয় মানুষের কাছে এ নিছকই একটি খেলা নয়—এটা বুক ভরে নেওয়া এক শ্বাস। কয়েকশো কোটি মানুষকে একই মুহূর্তে হাসানোর, কাঁদানোর, চিৎকার করানোর এক যুথবদ্ধ অজুহাত। ইরানের ফুটবলও ঠিক তেমন। তেহরানের আজাদী স্টেডিয়ামে যখন গ্যালারি গর্জে ওঠে, তখন মনে হয় না এগারো জন খেলোয়াড় মাঠে নেমেছে; মনে হয় একটা দেশ নেমেছে, যাদের কাছে ফুটবল মানে বেঁচে থাকার দর্শন।
ইরানের ফুটবলের পরিচয় টিকিটাকা নয়, সাম্বা নয়, পজিশনাল প্লে নয়। তাদের পরিচয় দুর্দান্ত ডিফেন্সিভ শেপ, সেকেন্ড বল উইন করার খিদে, আর হঠাৎ এক ঝলকে ভার্টিক্যাল ট্রানজিশন। দুটো পাস, একটা থ্রু বল, একটা রান ইন বিহাইন্ড, একটা কাউন্টার, এবং গোলওওও—এটাই ইরান। প্রজন্ম বদলায়, জার্সির ডিজাইন বদলায়, কিন্তু বদলায় না এক জিনিস—শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার অভ্যাস।
মনে আছে গত বিশ্বকাপের কথা? মাঠে জাতীয় সংগীত বাজছে, কিন্তু ইরানের খেলোয়াড়রা নীরব। সেই নীরবতায় মুখ গুঁজে ছিল এক ধরনের আর্তনাদ—রাজনৈতিক, মানবিক, ব্যক্তিগত সব স্তর ছুঁয়ে যাওয়া এক নীরব প্রতিবাদ। বিশ্লেষকেরা সেই নীরবতাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মারপ্যাঁচে বয়ানের চেষ্টা করেছিলেন, মানবিকতার জায়গা থেকে অনেকেই তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। যাবতীয় তত্ত্বতালাশকে পাশ কাটিয়ে সেই নীরবতার অনুবাদ কী একথাই বলে না, একটা বল ঘিরে ছুটে বেড়ানো ওই খেলোয়াড়েরাও মানুষ? তাদেরও পরিবার রয়েছে, ভয়ভীতি, ক্ষুধায় তারাও পীড়িত হন– সবচেয়ে বেশি যে কথাগুলো নীরব থেকেও সরব হয়ে ওঠে, সেটা হলো, ওই মানুষগুলো বুকের ভেতর আমার আপনার মতো একটা দেশের মানচিত্র বয়ে বেড়ায়। সেই মানচিত্রের প্রতি আপনার আমার মতো তাদের ভালোবাসাও কোনো অংশে কম নেই। অন্যদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে অপমানিত হওয়া তাদের জন্য কতটা ক্ষরণের বোঝেন সেটা? বিশ্বকাপের নামে আয়োজক দেশের একটি হয়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানকে শুধুমাত্র খেলার অনুমতি দেয়, অবস্থানের অনুমতি দেয় না; খেলা শেষের কয়েক ঘণ্টার ভেতর তাদের পাড়ি জমাতে হয় মেক্সিকোর অনুশীলন ক্যাম্পে– তখন আগত অতিথির ওপর এমন অমানবিক অসৌজন্যে মন ব্যথিত যেমন হয়, লজ্জিত কম হয় না।
এবারের বিশ্বকাপেও চোখ ঝলসানো আয়োজনের কোণ জুড়ে থেকে গেছে থোক অন্ধকার। যে অন্ধকার আফ্রিকান দরিদ্র দেশ হাইতির জার্সির ওপর খড়গহস্ত হয়। দেশটা ক্ষমতাশালী-ধনী হলে এমন দাদাগিরির আগে ফিফা অন্তত বারকয়েক ভাবতো। হাইতির জাতীয় দলটি তাদের জার্সিতে ভার্তিয়ের যুদ্ধের স্মৃতির স্মারক ব্যবহার করতে চেয়েছিল, যা ফিফার বাধার মুখে পড়ে। একটা দেশ তাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে সেরকম কিছু ব্যবহার করলে সমস্যা কোথায়? শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে হাইতি স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তারই প্রতীক ব্যবহারে সাম্রাজ্যবাদী ছাড়া আর কাদের গাত্রদাহ হতে পারে! বিশ্বকাপের আসরের দ্বার উন্মোচনের সময় যতই ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক সম্মান-সৌজন্য রক্ষার বাগাড়ম্বর করা হোক না কেন, আদতে প্রভুসত্তার আচরণ সরবে-নীরবে চলমানই থাকে। যা কখনো ইরান, কখনো হাইতির কারণে প্রচারে চলে আসে। আমরা জানতে পারি এইসব অসৌজন্যতার দাস্তান। আদতে যতই যুথবদ্ধতার গালগল্প হোক, বিশ্ব আসরের আয়োজনে ভাইভাই আচরণ সর্বস্ব মহড়া দেখানো হোক, খেলার সৌজন্য বজায় রাখার জন্য যতদিন আড়ালের ক্ষমতার কলকাঠি নাড়া বন্ধ না হবে, ততদিন বড়মাছ ছোটো মাছকে গিলে গিলে পেট ফোলাবে। অন্তত বেঁচে থাকার কালে এ আশা পূরণ হওয়ার কোনো আলামত দেখছি না।
আলাপ শুরু করেছিলাম ইরান দলকে নিয়ে, যে দলটি গোটা জাতি নিয়ে মাঠে নামে। মেরুদণ্ড সোজা রেখে প্রতিবাদ জানায়। এবারের আসরেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এবার ইরানের খেলোয়াড়েরা মাঠে নেমেছিলেন ছোটো ছোটো স্কুল ব্যাগ নিয়ে! ক্ষমতাশালী এই দেশেটার যুদ্ধ নামের দম্ভের আঘাতে যে নিষ্পাপ শিশুগুলো ঝরে গেছে— তাদের স্মরণে ম্যাচটি উৎসর্গ করা হয়। নিজেদের মতো করে তাদের জানানো প্রতিবাদে যুদ্ধবাজদের বিবেক হয়তো বিন্দুমাত্রও আন্দোলিত হয় না; মাঠভরা দর্শক, যাদের অধিকাংশই সাধারণ মানুষ, তাদের বা ঘরে বসে সেই মর্মন্তুদ দৃশ্য যারা দেখলেন, তাদের হয় বইকী!
বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর কত কত গল্পই না তৈরি করে চলে। ভোজিনিয়ার কথাই ধরা যাক। অখ্যাত কেপ ভার্দের গোলকিপার ভোজিনিয়ার গল্পটা কি সিনেমার মতো নয়? কে বলবে এই লোক প্রথমবার বিশ্বকাপের মতো একটা আসরে খেলতে নেমেছেন? ৪০ বছর বয়সে এসে নিজের দেশের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচে দাঁড়িয়ে স্পেনের একের পর এক আক্রমণ আর দুর্দান্ত সব শট ঠেকিয়ে দলকে বাঁচানো চাট্টিখানি কথা নয়। অনাগত ভবিষ্যৎ তাঁর এই গল্প তুলে রাখবে সযত্নে তাঁর উত্তরপুরুষের জন্য। শুধু কেপ ভার্দের ভোজিনিয়ার গল্প না, ঘানার গোলকিপার বেঞ্জামিন আসারের কথা না বললে মহা অন্যায় হবে। ২০২৬ এর বিশ্বকাপ আসরে এখন পর্যন্ত তিনি বিশেষভাবে আলোচিত একজন। এখন পর্যন্ত তাঁর পারফরম্যান্স ঘানাকে বাঁচিয়ে রেখেছে একাধিক ম্যাচে, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। তৃণমূল থেকে উঠে আসা বেঞ্জামিন যেন এক আগুন পাখি। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত যাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি। এমন মানুষের আরো আরো গল্প জমবে বিশ্বকাপ আসরের হাত ধরে। কথায় বলে না, আসলের চেয়ে সুদ বেশি মিষ্টি! এসব গল্প সেরকম মিষ্টি না হলেও হিরন্ময় — যা সময় উজিয়ে বেঁচে থাকবে। বেঁচে থাকবে তাদের জন্য, যারা স্বপ্ন দেখতে চান, যারা স্বপ্নকে অবয়ব দেবার বাজিতে হারতে হারতেও জিতে যান। আর হেরেও যে বা যারা জিতে যায় তারাই তো বাজিগর!
ফুটবল হয়তো পৃথিবী বদলে দিতে পারে না। যুদ্ধ থামাতে পারে না। অর্থনৈতিক সংকটও মুছতে পারে না। কিন্তু ফুটবল একটা কাজ করতে পারে, অযুত-নিযুত মানুষকে একই সময়ে একসঙ্গে স্বপ্ন দেখা শেখাতে পারে। কখনো কখনো বেঁচে থাকার জন্য এইটুকুই বা কম কী!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন