অতিচিন্তা: চক্রব্যূহের অভিশাপ
আমরা অনেকেই অতিরিক্ত চিন্তার জালে জড়িয়ে খামোখাই ক্লান্ত হই। হয়তো প্রকৃত ঘটনার অনুবাদ সম্পূর্ণই ভিন্ন; না বোঝার ফলে সেটা আত্মক্ষরণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যা শুধু পোড়ায় না, যথেষ্ট সময় নষ্টেরও কারণ হয়। এমন ঘটনায় আমিও যে জড়াই না তা নয়, তবে বিভ্রান্তির জাল মেরেকেটে দ্রুত বেরিয়ে পরার একটা বিল্টইন প্রসেস নিজের ভেতর থাকায় ভোগান্তি কম হয়।
এমন সব বিষয় যা আমাদের অতিরিক্ত চিন্তার লুপে প্রলুব্ধ করে, সেরকম বিষয়বস্তু নিয়ে Eckhart Tolle প্রচুর লেখাজোখা করেন। ইনি অনেকের কাছে Modern spiritual philosopher হিসেবে পরিচিত। তাঁর ‘The Power of Now’ বা ‘A New Earth’ ব্যাপাক পাঠকপ্রিয় বই। এই বইগুলোতে তিনি আমাদের চিন্তার প্রকৃতি, অহং (ego), অতিরিক্ত চিন্তায় সময় নষ্ট না করে বর্তমান মুহূর্তে থাকা, মানসিক কষ্টের উৎস ইত্যাদি দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত বিষয়আশয় নিয়ে বলেছেন। তাঁর বলবার ভঙ্গিটি সরল এবং কিছুটা গল্পকথকের মতো।
তখন প্রথমজন ভাবতে শুরু করলেন, “তিনি কেন আমাকে এড়িয়ে গেলেন? গতবার কি আমি তাকে খারাপ কিছু বলেছিলাম? আমার ওপর কি তার কোনো ক্ষোভ জমা হয়েছে? আমি কি তাকে একটা টেক্সট করব? না, থাক।”
এভাবে তিনি একের পর এক চিন্তা করতে থাকলেন, যতক্ষণ না কয়েক সপ্তাহ পর আবার সেই লোকের সঙ্গে তার দেখা হলো। আদতে দেখা গেল, ওই লোক(যিনি অভিবাদনে সাড়া দেননি) সেই সময় এতটাই তাড়াহুড়োর মধ্যে ছিলেন যে তিনি প্রথমজনকে দেখতেই পাননি। অর্থাৎ, এতদিন যে সব চিন্তা করে প্রথমজন ক্লান্ত, সেটা কেবলই শক্তি-সময়ের অপচয়।
এমন ঘটনার গল্প পড়ার পর আমাদের অনেকেরই হয়তো হুবহু কিংবা কিছুটা এমন, প্রচুর গল্প মনে পড়বে। যা নিয়ে ভেবেটেবে আমরা কত না সময় অপচয় করেছি।
এরকম অতিরিক্ত চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। বিশেষ করে যারা লেখালিখি করি, সাধারণত, লেখকেরা অন্যদের তুলনায় বেশি সংবেদনশীল হয়ে থাকেন। সেরকম কেউ এধরনের পরিস্থিতিতে পড়লে অযথা ভেবে শরীর-মন-সময় নষ্ট না করে (সম্ভব হলে) সরাসরি কথা বলে একটা স্বাস্থ্যকর মীমাংসায় পৌঁছানো সবদিক থেকে মঙ্গল। যারা মাত্রারিক্ত সংবেদনশীল, এমন অযাচিত পরিস্থিতিগুলো তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে দাঁত বসাতে পারে। যদিও বাঙালি হিসেবে ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ বিষয়টিকে আমরা ভাশুরজ্ঞানে তার নামটা পর্যন্ত উচ্চরণ করতে দ্বিধা করি। অনেকে ‘মানসিক স্বাস্থ্য’ খায় না মাথায় দেয় কৌতুককর হাস্যরসের তোড়ে চালান করে দেই আমাজনের কোনো অন্ধকারে। যদিও মানসিক স্বাস্থ্য, এই লেখার বিষয় না; মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতনতা বাড়ানো খুবই জরুরি– এটুকু বলে মূল বিষয়ে ফিরি বরং।
কথা হচ্ছিল অতিরিক্ত চিন্তা নিয়ে, যা আমাদের বিক্ষিপ্ত করে, বিভ্রান্ত সময়ের ভুলভুলাইয়াতে ছুটিয়ে মারে। আমাদের ভেতর তৈরি হয় এক বিভ্রম, জীবননান্দের কবিতার মতো সে তখন বুড়বুড়ি কাটে:
মনের ভেতর এক ভুল জন্ম লয়;
“আমি তারে পারি না এড়াতে,”
সে আমার মনে বাড়ায় চাপ,
“সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়।”
কখনো কখনো, অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনায় আক্রান্তরা নিজের ভেতর বুঝি একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পান। যা তাকে ভাবতে শেখায় যে, সেটা তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর সবকিছুর ওপর মন্তব্য করতে থাকে। আপনার কাজ, আয়নায় প্রতিফলিত চেহারা, অতীতে কারো সঙ্গে হওয়া অমীমাংসিত কথোপকথন, সেটা কেমন ছিল বা আপনাকে কতটা বিদ্ধ করেছিল। অথবা পাঁচ বছর আগে বলা কোনো কথা যা আপনার এখনো মনে আছে; সবকিছু নিয়েই কণ্ঠস্বরটা সরব থাকে। সে আপনাকে অন্যদের সাথে তুলনা করায় লাগাতার ফুসমন্তর দিয়ে যায়। এমনকী ‘আপনি কেমন মানুষ’ এটাও সে অতি বাহাদুরির সঙ্গে আপনাকে জানিয়ে দেয়।
অধিকাংশ মানুষ এই কণ্ঠস্বরের বয়ানকে ‘ধ্রুব সত্যি’ বলে মনে করেন। তারা যখন শোনেন কণ্ঠস্বরটি বলছে “I’m bad at this”, তখন তারা চটজলদি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যে, “সত্যিই সংশ্লিষ্ট কাজে আমি পটু নই।”
আবার যখন শোনেন, কণ্ঠস্বর বলে, “তারা(হতে পারে আপনার পরিচিত কেউ) আমাকে পছন্দ করে না,” তখন অতিরিক্ত চিন্তায় অভ্যস্তরা সত্যিই ধরে নেন— “তারা আমাকে পছন্দ করে না।" এরপর তারা এমন এক ‘বয়ানকারী’র (narrator) রায়ের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে নিতেই দিন কাটান, যে বর্ণনাকারী অধিকাংশ সময়ই ভুল।
এরকম পরিস্থিতি তৈরি হলে গা ঝাড়া দিয়ে ভাবতে থাকুন, “ওই কণ্ঠস্বর মোটেও আপনি নন।”
এটা চিন্তার একটা প্রবাহ বৈ কিছু নয়। এর মধ্যে কিছু চিন্তা কাজের। বেশিরভাগই পুরনো চিন্তার পুনরাবৃত্তি। যার একটা বড় অংশই ভুল। ২০১০ সালে হার্ভার্ডের এক গবেষণায় ২,২৫০ জন মানুষের মনের বিচরণ বা মনোযোগের বিক্ষিপ্ততা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, মানুষ যখন কোনো কাজ করে, তখন প্রায় ৪৭ শতাংশ সময় তার মন সেই কাজ থেকে সরে গিয়ে অন্য কোনো দিকে চলে যায়।
তখন কিন্তু মন কোনো সুখকর চিন্তার জগতে হারিয়ে যায় না; বরং তা পুরনো ঝগড়া-বিবাদ, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা, অন্যদের সাথে নিজের তুলনা এবং নিজের কঠোর সমালোচনার মতো বিষয়গুলোর দিকেই ছুটে যায়। এমন এক ‘বক্তার’ কথা শুনতে শুনতে আপনার জেগে থাকা সময়ের অর্ধেকটাই কেটে যায় —যার কাছে কোনো মতামত বা মন্তব্যই চাওয়া হয়নি।
অস্তিত্বহীন উটকো এই বক্তার ভ্যাজর ভ্যাজরকে ‘ডিজিএম(দূর গিয়া মর)’ বলে সামনে এগোতে না পারলে চক্রব্যূহের অভিশাপ থেকে আপনাকে কেউ বাঁচাতে আসবে না।
[নওরোজিয়ান বন্ধু দারিয়ুসের কথোপকথন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা]
ছবি: এআই

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন