মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া
কিছু কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা খুব পরিচিত না হলেও দিব্যি আপনজন হয়ে ওঠেন। আর এই হয়ে ওঠা সম্ভব হয় ওই মানুষের নিজস্ব মুদ্রার জাদুকরী কৌশলেই। সেরকম একজন আপনজনের চলে যাওয়ার একযুগের বেশি সময় পূর্ণ হলো আজ ৩০ মে, ২০২৬ এ। ওঁর হঠাৎ চলে যাওয়ার দিনটিকে মনে করে এর আগে কখনো স্মরণে জানালায় দাঁড়াইনি। ঘড়ি-ঘন্টায় খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রিয়বন্ধুর জন্মদিন পড়ে যাওয়ায় জন্ম-মৃত্যুর দুটো দিন মনে মনেই স্মরণ করেছি—দুরকম অনুভূতির হাত ধরে। প্রিয় সেই বন্ধু, একান্ত অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিয়ে জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে চলে গেছে দূরে…
ঋতুপর্ণ ঘোষ, এই নাম উচ্চারণ করলেই মনে হয় যেন বৃষ্টিভেজা জানালার কাচে কেউ নরম আঙুলে গল্প লিখছে। তিনি নিছক কোনো চলচ্চিত্রকার নন; তিনি ছিলেন আমার মতো হাজারও বাঙালি মধ্যবিত্ত মনন, অবদমিত আকুলতা, লিঙ্গ-রাজনীতি, এবং সম্পর্কের সূক্ষ্ম টানাপোড়েনের এক সংবেদনশীল ভাষ্যকার। যে ড্রয়িংরুমে আলো-ছায়ার একঘেয়েমি দীর্ঘদিন ধরে জমে ছিল, ঋতুপর্ণ সেই ঘরটিকে নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছিলেন—রঙে, আলোয়, নীরবতায়, আর মানুষের গভীরতম সত্যে।
তাঁর চলচ্চিত্রে প্রবেশের দরজা খুলেছিল শৈশবের মায়া আর জাদু-বাস্তবতার হাত ধরে। ‘হীরের আংটি’-র সেই চেনা মায়া, হারিয়ে যাওয়া শৈশবের গন্ধ, একান্নবর্তী পরিবারের রহস্যময় বুনন—সব মিলিয়ে যেন ঘোষণা করেছিল এক প্রাজ্ঞ পরিচালকের আগমন। ঋতুপর্ণের চোখ বরাবরই আলাদা ছিল। একদিকে সমাজতাত্ত্বিকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, অন্যদিকে কবির মরমী স্পর্শ। এই দুই মিলে তাঁর সিনেমা হয়ে উঠেছিল মানুষের ভেতরের অদৃশ্য ঘরগুলোর মানচিত্র।
বাঙালির উৎসব-সংস্কৃতির আলো-অন্ধকারকে তিনি যেভাবে দেখেছিলেন, তা অনন্য। ‘উৎসব’ ছবিতে দুর্গাপূজার চারটে দিনকে পটভূমি করে এক বনেদি পরিবারের ভাঙন, অহংকার, দীর্ঘশ্বাস আর আড়ালের ক্ষতকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেছিলেন যে তা সিনেমার সীমানা ছাড়িয়ে এক জীবন্ত দলিল হয়ে ওঠে। সম্পর্কের এই জটিল রসায়ন যখন আরও ঘনীভূত হয়, তখন সামনে আসে ‘দোসর’। সাদা-কালোর সেই ক্যানভাসে দাম্পত্যের বিশ্বাসঘাতকতা, অপরাধবোধ আর ধূসরতাকে তিনি এতটাই সপাটে ছুঁয়েছিলেন যে দর্শক নিজের অজান্তেই আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।
মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্ম তন্ত্রীগুলোকে মেলানোর এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাঁর। ‘তিতলি’ ছবিতে মা-মেয়ের সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, প্রথম যৌবনের রোমান্টিকতা আর পরিণত বয়সের নস্টালজিয়াকে তিনি এমনভাবে পাশাপাশি বসিয়েছিলেন যে তা এক অদৃশ্য সেতুর মতো দুই প্রজন্মকে যুক্ত করে। আর ঠিক এই ঘরোয়া আবহের বিপরীতে, এক রুদ্ধদ্বার প্রকোষ্ঠে দাঁড়িয়ে তিনি বুনেছিলেন ‘রেইনকোট’। এক বর্ষণমুখর দিনে দুটি প্রাক্তন হৃদয়ের মুখোমুখি বসা, না-বলা কথার চাদরে নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করার যে আকুলতা, তা আজও প্রতিটা বৃষ্টির দিনে এক অপার নিঃসঙ্গতার জন্ম দেয়।
নারীর মনস্তত্ত্বকে তিনি শুধু বুঝতেন না, সেটিকে তিনি সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপনও করতেন। ‘বাড়িওয়ালি’-র বনলতা চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন মধ্যবয়স্কা নারীর অবদমিত কামনা, একাকিত্ব এবং সিনেমা-শিল্পের নির্মম ব্যবহারের করুণ আলেখ্য। অথচ এই একই পরিচালক যখন ‘শুভ মহরৎ’-এ আগাথা ক্রিস্টির ছাঁচে ‘রাঙাপিসি’ চরিত্রটিকে তৈরি করেন, তখন আমরা পাই এক ঘরোয়া, তীক্ষ্ণ, বুদ্ধিমতী বাঙালি গোয়েন্দাকে, যে রহস্যের জট খোলে পরম অবহেলায়।
রবীন্দ্র-মনস্তত্ত্বকে চলচ্চিত্রে রূপায়িত করার ক্ষেত্রে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ‘নৌকাডুবি’-তে কবির জটিল সামাজিক ও মানসিক সমীকরণকে তিনি দৃশ্যকাব্যে রূপান্তর করেছিলেন, যা তাঁর গভীর সাহিত্যবোধেরই পরিচয়। তবে শেষ লগ্নে এসে ‘সত্যান্বেষী’ যেন তাঁর সেই চিরচেনা জাদুকরী স্পর্শটিকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি। যে নিখুঁত ডিটেলিং আর নান্দনিকতার জন্য তিনি খ্যাত ছিলেন, সেখানে যেন এক বিষণ্ণ অপূর্ণতা থেকে গেলযে—যেন সময় তাঁকে আর একটু সুযোগ দিলে তিনি আবার ফিরে পেতেন নিজের ছন্দ।
ঋতুপর্ণকে কেবল তাঁর ছবির মাধ্যমে বিচার করা অসম্ভব। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অন্ধকার, একাকিত্ব, বাবা-মায়ের মৃত্যু, রাতের পর রাত নিভৃতে কাটানো সময়—এসব তাঁর শিল্পকে আরও গভীর করেছে। তিনি মৃত্যুকে দেখতেন এক অদ্ভুত যাত্রা হিসেবে—যেখানে আমরা প্রিয়জনকে ট্রেনে তুলে দিই, কিন্তু জানি না তারা কোন স্টেশনে নামল, চা খেল কি না, ট্রেন লেট হলো কি না। এই উপলব্ধি তাঁর লেখায় যেমন আছে, তেমনি আছে তাঁর সিনেমার নীরব ফ্রেমে।
সেলুলয়েডের ফিতের বাইরেও তাঁর ছিল রাজকীয় রাজ্যপাট। যেখানে ঋতু তুখোড় আর আন্তরিক এক ধারাভাষ্যকার। তাঁর লেখালিখির খাতাগুলো নিরন্তরই ফুটিয়ে গেছে শব্দ জোনাকি। ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি, অজস্র রবিবারের কলাম, ফার্স্ট পার্সনের মতো দ্যুতিময় আয়োজনগুলো আমাদের জন্য রেখে গেছেন। ফার্স্ট পার্সনে মায়ের স্মৃতি নিয়ে যেভাবে নিরন্তর এক অপেক্ষার কথা বলে গেছেন। তাঁর শেখানো মুদ্রা ধরে অপেক্ষায় থাকতে থাকতে, কারণে অকারণে তাঁর ফেলে যাওয়া রাজ্যপাটের বলয়ে ঢুকে গিয়ে তাঁকে ফিরে ফিরে পাওয়ার এক অন্তহীন ভ্রমণে আমিও বুঝি যাত্রী। যদি ঋতু ফিরে আসেন তাঁর ফেলে যাওয়া অর্ধেক কাজগুলো শেষ করার তাগিদে! যদি আসেন, আর দেখাও পেয়ে যাই? সেই লোভ ছেলেভোলানো কৌশলে জাগিয়ে রাখে। ঋতুচক্রের মতো বৈচিত্রে ভরা ঋতুপর্ণের সঙ্গে সে মোলাকাত নিতান্তই কম পাওয়া হবে না।
ঋতুপর্ণ আজ নেই, অথচ তিনি রয়ে গেছেন আমাদের জীবন যাপনে, নকশি আঁচলের বিন্যাসে আলতার গাঢ় লালে, কাসার বাসনের শব্দে, বৃষ্টির দিনে জানালার কাচে জমে থাকা নীরবতায়। তিনি রয়ে গেছেন আমাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনে, আমাদের একাকীত্বের নিঝুম দুপুরে, আমাদের মনখারাপের অচেনা কোণে। তিনি রয়ে গেছেন অনুভবের এক অবিচ্ছেদ্য দোসর হয়ে। আত্মার আত্মীয় অভিমানী সেই দোসরকে কে পারে এড়াতে!

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন