বন্ধু হয়ে তুমি আছো যে দাঁড়ায়ে...

 

“…ম্বা আলখাল্লা জড়ানো দাড়িওয়ালা ঋষির মতন মানুষটার ছবির সামনে এসে দাঁড়ায় সে। বড়দা বলে, যখন মনে হবে বুকের ভেতর কষ্টগুলো কেবলই ভারী হচ্ছে, তখন এঁর বইয়ের কাছে আশ্রয় চাইবি।” কেবল গল্প-উপন্যাসের চরিত্র নয়; বাস্তবে, আমরা শতকোটি বাঙালি আপনার শব্দ-বাক্যের কাছে প্রতিদিন—প্রতি মুহূর্তে আশ্রয় চাই এবং পাই। আপনি আমাদের ভরসার জায়গায় ছিলেন-আছেন-থাকবেন। প্রিয় বুড়ো, শুভ জন্মদিন!


প্রিয় একটি কবিতা:

'মিথ্যে কথা'
-শঙ্খ ঘোষ

লোকে আমায় ভালোই বলে দিব্যি চলনসই
দোষের মধ্যে একটু নাকি মিথ্যে কথা কই।
ঘাটশিলাতে যাবার পথে ট্রেন-ছুটছে যখন
মায়ের কাছে বাবার কাছে করছি বকম বকম।
হঠাৎ দেখি মাঠের মধ্যে চলন্ত সব গাছে
এক একরকম ভঙ্গি ফোটে এক একরকম নাচে।
“ওমা , দেখো নৃত্যনাট্য” -যেই বলেছি আমি
মা বকে দেয় , “বড্ড তোমার বেড়েছে ফাজলামি।”
চিড়িয়াখানার নাম জানো তো আমার সেজ মেসোর
আদর করে দেখিয়ে দিলেন পশুরাজের কেশর।
ক’দিন পরে চুন খসানো দেয়াল জুড়ে এ কী
ঠিক অবিকল সেইরকমই মূর্তি যেন দেখি ?
ক্লাসের মধ্যে যেই বলেছি সুরঞ্জনার কাছে
“জানিস ? আমার ঘরের মধ্যে সিংহ বাঁধা আছে !”
শুনতে পেয়ে দিদিমণি অমনি বলেন “শোন ,
এসব কথা আবার যেন না শুনি কখনো।”

বলি না তাই সে সব কথা সামলে থাকি খুব
কিন্তু সেদিন হয়েছে কি এমনি বেয়াকুব-
আকাশপারে আবার ও চোখ গিয়েছে আটকে
শরৎ মেঘে দেখতে পেলাম রবীন্দ্রনাথকে।



সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষের মতে, "পৃথিবীর সব গল্প বলা হয়ে গেছে, এখন কীভাবে বলতে হবে সেটাই জানা প্রয়োজন।" প্রয়োজনের এই হ্যাপা গল্প বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে বেশ কৃতিত্বের সাথেই সামাল দেবার নজির রেখেছেন সাহিত্যিকেরা। কিন্তু কবিতা- গানের বেলায়, বিশেষ করে গানের ক্ষেত্রে বেশ একটু নাজেহাল অবস্থা যেন। ওঁর গানের বাণীর সামনে বুকটান করে দাঁড়াবার ক্ষমতা খুব কম গানে পাই। এমন অবস্থায় হতাশ হবার প্রবল আশঙ্কা, মানুষ মাত্রই রাগে ক্ষোভে আক্রান্ত হবার কথা। তবে আশ্চর্য, এহেন মানুষের ওপর রাগ বা ক্ষোভের ধৃষ্টতা আসে না আসলে। যা আসে সেটা অবাক মুগ্ধতা, অপার বিস্ময়। একজন মানুষের এতটা লেখার, এতটা সইবার ক্ষমতা সত্যি বিরল। অবশ্য বাঙ্গালি মাত্রই রবীন্দ্রনাথকে মাথায় তুলে নাচেন, এমন না। একদল ভক্তির আতিশয্যে আকাশে উঠিয়ে মাটির মানুষটির 'দেহখানি তুলে' ধরতে চান, তাতে করে যে ঠাকুরটির মাটির সাথে সম্পর্ক ঘুঁচে যাবার জোগাড় হয় সেটি মাথায় থাকে না সেপক্ষের। এমন না করে তারা যদি রবীন্দ্রনাথের চাওয়া সমাজ, শিক্ষা, সংস্কারের অচলায়তন ভাঙবার যে ইচ্ছেটি ছিল, তা পূরণে মনোযোগ দিতেন তবে রবি ভক্তি সঠিক পথের দিশা পেতো। অন্যপক্ষ আকাশ থেকে পাতালে টেনে নামাতে পারলে বেশ হতো'র এক ধরনের কাল্পনিক সুখে বিভোর হয়ে যৌক্তিক- আযৌক্তিক কেচ্ছা কাহিনি রচনায় মত্ত থাকেন। সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামের এই অবাক মানুষটির জীবিতকালেও যেমন ছিল, আজও আছে। হয়তো আক্রমণের লক্ষ্য ঘুরেছে। এই দলটিও বুদ্ধি বিবেচনার মাথাটি ভক্ষণপূর্বকই এহেন কার্য সাধনে মত্ত থাকেন। নাহলে এটুকু বোধে আসতো বৈকি, যাঁকে কেন্দ্র করে কলমবাজি, সেটা কতটা সত্যের প্রতি আন্তরিকতায়, আর কতটা ব্যবসায়িক কাটতির কাছে বন্ধক থাকবার আকাঙ্ক্ষায়।

অবশ্য বিখ্যাত মানুষদের সাহিত্য বিচারের পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনকে আলোচনায় টেনে আনবার দায় শুধুমাত্র বাঙ্গালীর একচেটিয়া তা কিন্তু না। রোমান্টিক আন্দোলনের কবি লর্ড বায়রন থেকে শুরু করে অনেকেই স্বদেশিদের দ্বারা সংশ্লিষ্টদের সাহিত্য বিচারের চেয়ে তাঁদের অমিতব্যয়িতা, বহুগামিতা ইত্যাদি বিষয়ে সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত হতে হয়। শেক্সপিয়রের সাহিত্য সমালোচনার পাশাপাশি একই কারণে আলোচনার বস্তু হয় তাঁর সহধর্মীণীটি কতখানি দজ্জাল ছিলেন সেটি। তাঁর কৃত অশান্তির কারণে শেক্সপিয়র কতখানি দগ্ধ হয়েছেন ইত্যাদি বিষয় জানবার আগ্রহে অনেকেরই পেটের ভাতটি চালে রূপান্তরিত হয়ে কোষ্টকাঠিন্যের কারণ হয়েছে। জীবনানন্দ দাশ যেমন নিস্তার পান না লাবন্য দাশের সাথে তাঁর সুখহীন দাম্পত্য জীবনের আলোচনা থেকে। নজরুলের বাঁধনহারা প্রেমিক জীবনের রসালো কাহিনি, নার্গিস আসার খানম ও প্রমীলা দেবীর সাথে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক তাই আম পাঠক থেকে শুরু করে বিজ্ঞ গবেষকের কাছে আদরের বস্তু হয়ে দেখা দেয়। হয়তো আসলের চাইতে সুদের মিষ্টতা বেশি, যে কারণে মাছির মতো হামলে পড়ার একটা প্রতিযোগিতা চলে আমাদের মধ্যে। প্রতিযোগিতা চলে, কে কতখানি মুখরোচকভাবে বিখ্যাতদের হাঁড়িটি হাটে ভাঙতে পারি। সফল মানুষকে হেনস্তা করবার মধ্যে যে এক ধরনের পাষবিক আনন্দ আছে, তা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করলে চলে নাকি!

সামান্য বুদ্ধিতে যেটুকু বুঝি, কেউ সমালোচনার উর্দ্ধে নন। শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথও একজন মানুষই ছিলেন। দোষ ত্রুটি তাঁরও ছিল বৈকি। সেসব নিয়ে সমালোচনা হোক ক্ষতি নেই, কিন্তু তাতে যুক্তি খণ্ডনের চেয়ে ভেতরের বিষ উগলে দেবার প্রবণতা ভয়াবহ। রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের সেই বিষমাখা কটাক্ষের সামান্য নমুনা,

"উড়িসনে রে পায়রা কবি
খোপের ভিতর থাক ঢাকা।
তোর বক্বকম আর ফোঁস ফোঁসানি
তাও কবিত্বের ভাব মাখা!
তাও ছাপালি, গ্রন্থ হলো
নগদ মূল্য এক টাকা"


যে রবির কিরণে বাঙলা সাহিত্য জগত ঋদ্ধ, তাঁর উদ্দেশ্যে এহেন কটুক্তিতে রবীন্দ্রনাথের কিচ্ছুটি যায় আসেনি বলাই বাহুল্য। কালের পানে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বুড়োর সৃষ্টি আজও সমকালীন, আজও অপার আনন্দের আধার। কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদদের কেউ সেভাবে মনে রাখেননি। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনযাপনে সূর্যের আলো নিয়েই বুঝি রবীন্দ্রনাথ জ্বলজ্বল করেন। বহু-বহু বাঙালির প্রাণে তাঁর নিত্যই আসা-যাওয়া!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাদ যাবে কি মুজিব(বাদ!)?

শান্তির ছদ্মবেশে কি স্বাধীনতাহরণ?

বড় বেদনার মতো বাজে...