ফুলগুলো সব যাচ্ছে ঝরে, সতর্ক হও...
বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে। এটি এখন আর শুধুমাত্র একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়; এটি একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার দলিল। বিশেষ করে যখন ইউনিসেফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা এই মহামারীর বিষয়ে আগাম সতর্কবার্তা দিয়েছিল, তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সেই সতর্কতা আমলে না নেওয়া বা সময়মতো পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হওয়া এই মৃত্যুমিছিলকে দীর্ঘায়িত করেছে। সরকারি হিসাবে সাড়ে তিনশ এবং বেসরকারি হিসাবে আরও অসংখ্য শিশুর মৃত্যু রাষ্ট্রের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য কাঠামোর নগ্ন রূপটিই ফুটিয়ে তুলছে।
হামের প্রাদুর্ভাব হুট করে আকাশ থেকে পড়েনি। ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার সতর্ক করেছিল যে, রুটিন টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের গ্যাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেখুনদারি সর্বস্ব পরিবর্তনের ডামাডোলে স্বাস্থ্য খাতের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমগুলো প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা জানালেও, নীতিনির্ধারকরা পতিত সরকার ও আওমীলীগকে যতভাবে সম্ভব টাইট দেবার, প্রশাসনিক রদবদল আর উচ্চপর্যায়ের সংস্কার সংস্কার খেলা নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে, তৃণমূলের শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল না। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল চোখে পড়ার মতো। টিকার মজুত থাকা সত্ত্বেও তা সময়মতো বিভিন্ন জেলা বা দূরবর্তী এলাকাগুলোতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি কেন, তার জবাব দেওয়ার কেউ নেই।
সাড়ে তিনশ বা তারও বেশি শিশু যখন একটি সাধারণ টিকার অভাবে মারা যায়, তখন একে কেবল 'দুর্ঘটনা' বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড।
১.অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অগ্রাধিকারের ভুল: রাষ্ট্রের বড় বড় সংস্কারের কথা বলা হলেও, নাগরিকদের জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা—বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য—কেন উপেক্ষিত থাকলো? ইউনিসেফের সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও কেন জরুরি ভিত্তিতে ‘ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন’ শুরু করা হলো না? ২. মাঠপর্যায়ে শূন্যতা: ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সময় অনেক এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত হয়েছেন বা নিরুৎসাহিত বোধ করেছেন। প্রশাসন এই সংকট নিরসনে কোনো বিশেষ সুরক্ষা বা দিকনির্দেশনা দিতে পারেনি। ৩. তথ্য লুকানোর সংস্কৃতি: অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের মধ্যে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বেসরকারি তথ্যের চেয়ে সরকারি হিসাবের এই বিশাল ফারাক প্রমাণ করে যে মৃত্যুর ভয়াবহতাকে ছোটো করে দেখানোর চেষ্টা বর্তমানেও সচল রয়েছে।
একটি রাষ্ট্রের সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি তার জিডিপি বা বড় বড় ভবন নয়, তার শিশু মৃত্যুর হারও এক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যাক্টর। শিশুরাই দেশ-রাষ্ট্রের ভবিষ্য। আজ যখন বাংলাদেশের মায়েদের বুক খালি হচ্ছে, তখন সেই কান্নার আওয়াজ কি সচিবালয়ের দেয়াল ভেদ করে আপনাদের কানে পৌঁছাচ্ছে? ‘সবার আগে বাংলাদেশ স্লোগান’এর জন্মদাতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আপনার পারিবারিক কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ডের ফাঁকে, একবার চোখ-কান খুলে ‘হাম পরিস্থিতি’র গুরুত্ব অনুধাবনের কষ্ট করবেন প্লিজ! আপনার আচার-আচরণে এটা দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট, পরিবার আপনার কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ! কাজেই অন্যের পরিবার যখন ভেসে যেতে বসেছে, তখন নিশ্চয়ই আপনি আত্মকেন্দ্রিকতায় ডুবে থাকতে চাইবেন না। আপনি চারপাশের মোসাহেবদের তেলবাজি হটিয়ে তদন্তের হুকুম দিন, সত্যি বেরিয়ে আসুক— কেন ইউনিসেফ যখন বারবার বলেছিল টিকাদান বাড়াতে, তখন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমার অযোগ্য নির্লিপ্ততা দেখাতে পারলেন কীভাবে? কি কারণ ছিল? আপনি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে প্রমাণ করুন যে, সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অতটাই বড় নয়। হামে আক্রান্ত হয়ে যারা অন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা প্রতিবন্ধী হচ্ছে, তাদের আজীবনের অভিশাপ কি এই সরকার নিতে পারবে? এই গাফিলতির দায় কেবল(পূর্বের সরকারকে এই দায় দেবার উপায় যেহেতু নেই) নিচের সারির কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ওপরতলার দায়িত্বপ্রাপ্তরা পার পেতে পারেন না।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে আমাদের দাবি হওয়া উচিত সুস্পষ্ট— তদন্ত কমিশন গঠন: ইউনিসেফের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও কেন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তার কারণ উদঘাটনে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে।
জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান: কোনো অজুহাত ছাড়াই প্রতিটি পাড়ায়, গ্রামে এবং দুর্গম পাহাড়ে টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
ক্ষতিপূরণ ও দায় স্বীকার: যে পরিবারগুলো তাদের প্রিয় সন্তান হারিয়েছে, তাদের কেবল সান্ত্বনা নয়, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দায় স্বীকার করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
আমরা আর প্রচার সর্বস্ব সংস্কার বা গালভরা ফাঁপা গল্পের ভাগিদার হতে চাই না। যেখানে আমাদের শিশুরা বিনা চিকিৎসায় মারা যায় সেখানে আমি-আমরা আত্মমগ্নতায় ডুবে থাকতে পারি না। এটা মহা অন্যায়—অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে দেখার দায়বদ্ধতা না থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আপনাকে-আমাকে-আমাদের ক্ষমা করবে না। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকারের সফলতা সত্ত্বেও, অন্তর্বর্তী সরকারের গাফলতি এবং ইউনিসেফের মতো সংস্থার সতর্কবার্তায় কান না দেওয়ার মাশুল আজ সাধারণ মানুষ দিচ্ছে। সংস্কারের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত নাগরিকদের জীবনের সুরক্ষা, এই সরল সত্যিটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বুঝেও না বোঝার ভান ধরেছিল। আপনি-আপনারা সে ভুলের বৃত্তে পা রাখবেন না প্লিজ! ফুলের মতো আরও অনেক শিশু যেন প্রশাসনিক উদাসীনতার বলি না হয় এটাই এখন সময়ের দাবি।
গাফিলতির এই দায়ভার থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, যখন দেশ জুড়ে মৃতশিশুদের পরিবার হাহাকার করছিল, রাষ্ট্র তখন ঘুমিয়ে ছিল। আর রাষ্ট্র প্রধান হয়ে আপনি, ‘কেবলি মিথ্যে স্বপন’ করেছি বপনে কালক্ষেপন করে গেছেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন