যেতে যেতে মা বুঝি তাঁর ছায়া গেছে ফেলে...
“When I find myself in times of trouble, Mother Mary comes to me
Speaking words of wisdom, let it be”--Beatles
এদেশে আসার পর একদিন খেয়াল করলাম আকাশে ফুটে থাকা চাঁদটা অনেক গোলগাল আর আকারেও যেন বড়সড়। দেখতেও সুন্দর। দেশে থাকতে চাঁদকে এত কাছের মনে হয়নি তো! এ কথা শুনে মা হাসতেন। বলতেন, আমেরিকানরা চাঁদে গেছে তাই ওদের সঙ্গে সখ্যতা বেশি, চাঁদও বড়। তখন আমার সেলফোনটা ছিল গরিবের গরিব। ক্যামেরা না থাকায় বড়সড় চাঁদটাকে কখনো দেখানোর সুযোগ হয়নি মাকে। দুইপ্রান্তে বসে দুজন দিন রাতকে সামনে রেখে চাঁদের প্যাচাল করতাম। আগডুম-বাগডুম আরো কত কী যে গল্প করতাম। ভাবতাম, আর তো মাত্র কয়েকটা দিন–তারপর মা এখানে এলে, দুজন পাশাপাশি বসে চাঁদ দেখা যাবে।
যদিও মা এদেশে স্থায়ীভাবে থাকতো না, নিজের দেশটা যে তাঁর জান। শিক্ষা-চাকরি ইত্যাদি সূত্রে বাবাকে দীর্ঘসময় ইউরোপের নানা দেশে থাকতে হয়েছে। আমাদের কারণে পাকাপাকিভাবে ওখানে গিয়ে থাকা মায়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তেমনটা হলে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি বলার সুযোগটা বড় ভাইবোনেরা বাদে আমরা হয়তো পেতাম না। শিকড়, ছেলেপুলে ইত্যাদির অজুহাতে মা বরাবর দেশে থাকতে চেয়েছেন। বাবাও যে খুব একটা বিদেশ থাকার পক্ষপাতি ছিলেন তাও না। ওঁদের বোঝাপড়াটা ছিল চমৎকার। যে কারণে কোনো তিক্ততা ছাড়াই যে যার মতো থাকার স্বাধীনতা বেছে নিয়েছিলেন। বাবা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে ভুবনডাঙ্গার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া পর মা কেমন একা হয়ে গেলেন। আমরা ভাই-বোনেরা বাবাকে ভাবতাম বটবৃক্ষ, আর মা তার ছায়া। গাছ না থাকলে ছায়া কেমন নিরম্বু হয়ে পড়ে–সেই প্রথম জেনেছি। এখন মাও যখন পৃথিবী আর সন্তানদের মায়া কাটিয়ে বাবার কাছে চলে গেছেন, তখন এক মন শান্তি পেলেও অন্য মনটা কেমন ঠোঁট ফোলায়। মা দিবসে সেই অভিমান বোকা বালকের অভিমান হয়ে মাত্রা ছাড়ায়... মাকে হেথায় খুঁজি, হোথায় খুঁজি। পাবো না জেনেও খুঁজে বেড়ানোর পালা ফোরায় না ... আকাশে গোলপানা বড়সড় চাঁদটা এখনও আগের মতোই ওঠে। শুধু মায়ের সঙ্গটা আর পাওয়া হয় না...

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন