বিদায় আমাদের যুদ্ধদিনের পরম বন্ধু, রঘু রাই...


আমরা কি বিস্মৃত হতে ভালোবাসি? মানুষমাত্রই বিস্মৃত প্রিয়? কী ভুলতে চাই আমরা? মানুষ সাধারণত ক্ষতময় স্মৃতিকে ভুলে থাকায় স্বস্তি খোঁজে। স্মৃতির যে ক্ষত আমাদের অসুস্থ করে তোলে তাকে বিস্মৃত হওয়ায় স্বস্তি হয়তো আছে— তাতে আত্মার গহীন কোণে অস্বস্তি জমতে জমতে যে পাহাড় হয়ে ওঠে না, সেকথা বুকে কিল মেরে বলা সম্ভব নয়। হঠাৎ কেন স্মৃতি-বিস্মৃতি নিয়ে পড়লাম? একটা মৃত্যু কেমন অপরাধী করে তুললো। অস্বস্তি তৈরি হলো ভীষণ। মৃত্যুর সে খবর সামনে এসে হুট করে খুলে দিলো স্মৃতির দরজা। সেই দরজা বেয়ে সামনে এলো আমাদের সবচেয়ে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের সাদাকালো গুচ্ছ গুচ্ছ ছবি।




সময় যেখানে থমকে আছে। যুদ্ধদিনের সেসব স্থিরচিত্রে খুব বেশিসময় তাকিয়ে থাকা কষ্টের— বুকে ব্যথা ঘুরে ঘুরে কেবলি চিবুক নাড়ে: কত ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের স্বাধীনতা! কত লক্ষ-কোটি হা হাকারে বাতাস ভারী করে তবেই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভূখণ্ডে নেমে এসেছিল চূড়ান্ত বিজয়! গুচ্ছ গুচ্ছ সেসব স্থিরচিত্রে বেশির ভাগটাই যাঁর ক্যামেরায় বন্দি হয়েছিল। যিনি পরম মমতায় সেই সময়কে তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন— ওই সময় তাঁর তোলা ছবিগুলো ছাড়া আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ভিজ্যুয়াল স্মৃতি প্রায় অর্ধেক হয়ে যেত। অথচ সেই মানুষটিকে ঠিকঠাক মনে রাখার সৌজন্যটুকু পর্যন্ত আমরা হয়তো দেখাইনি।



আজ ক্যামেরা, সময়ের অজস্র দলিল; ইতিহাসের সাক্ষী-সবুদ সবকিছু ফেলে তিনি যখন চলে পাড়ি জমালেন অনন্ত সীমান্তের দেশে—তখন আমাদের মনে পড়ে গেল— আহা তিনি তো আমাদের যুদ্ধদিনের সারথী! জানি, এই স্মরণ তাঁকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করবে না। তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে পা রেখেছেন। যাবতীয় ত্রুটি স্বীকার করে শ্রদ্ধেয় রঘু রাইকে তাঁর বিদায় দিনে, শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় স্মরণ করছি।



বাংলাদেশ যতদিন টিকে থাকবে—মুক্তিযুদ্ধও টিকে থাকবে। ততদিন নিশ্চিতভাবে থেকে যাবে যুদ্ধদিনের দলিল হিসেবে রঘু রায়ের তোলা অজস্র ছবি। তাঁকে ভুলে যেতে চাইলেও সম্ভব হবে না। স্মৃতির যে ক্ষত আমাদের অসুস্থ করে, স্মৃতি রোমন্থনই সেই ক্ষত খুঁজে নেবে সুস্থতার পথ। স্মরণের জানালায় বার বার, ফিরে ফিরে, উঁকি দিয়ে যাবেন রঘু রাই!



বিদায় বাংলাদেশের পরম বন্ধু শ্রদ্ধেয় রঘু রাই। আপনার অনন্তের যাত্রা শান্তির হোক!

ছবি ঋণ: অন্তর্জাল

 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাদ যাবে কি মুজিব(বাদ!)?

শান্তির ছদ্মবেশে কি স্বাধীনতাহরণ?

বড় বেদনার মতো বাজে...