The Children's Train

 



The Children's Train দেখলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কাহিনি নিয়ে সিনেমা। যুদ্ধের সিনেমার প্রতি বরাবরের দুর্বলতা। যুদ্ধকালীন মনুষ্য চরিত্র খুঁটিয়ে দেখার এবং বোঝার চেষ্টা করি। যুদ্ধ বা ক্রান্তিকালে মানুষের দুটো সত্তাই প্রকট হয়। তার ভেতরের দানব কিংবা দেবতা পরিস্হিতি ঘোলাটে কিংবা সামালের তাগিদ নিয়ে বুঝি বেরিয়ে আসে। এ যাবত বহু যুদ্ধের সিনেমা দেখেছি(I'm not showing off. )। সেসব ঘটনার খাপে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে বসানোর চেষ্টা করি প্রায়শই। চিলড্রেন'স ট্রেন দেখতে গিয়ে যেমন ভাবছিলাম, এমনটা যদি একাত্তরে ঘটতো, তাহলে কী হতে পারতো। এক ভারত ছাড়া আর কেউ কি ট্রেন অফ হ্যাপিনেসের সদিচ্ছায় এগিয়ে আসতো? আজকে যারা মহামান্যের ইয়ারবকশি, তাদের সংগঠন আলবদর আলশামসেরা ট্রেন ভরতি শিশুগুলোকে নিয়ে কী করতো? ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠেছি। ভাবনা মূলতবি রেখে হাঁড় জিরজিরে আমেরিগোর পিছু নিয়েছি।

Trains of Happiness বা Treni della Felicità, আমাদের সেই গন্তব্যে নিয়ে যায়, যার গহিণে জমা আছে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কষ্ট, প্রাপ্তির আনন্দ, যুদ্ধ পরবর্তী হামুখো দারিদ্রে ডুবে থাকা একটা সমাজ,কমিউনিস্ট শাসন ঘিরে গুজব, ইত্যাদি নানামুখী অভিঘাত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দারিদ্র্যপীড়িত ইতালির দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চলে অস্থায়ীভাবে প্রায় ৭০,০০০ ইতালীয় শিশু স্থানান্তর করা হয়েছিল। ট্রেন অফ হ্যাপিনেস খ্যাত সেই ট্রেনগুলো ইতালির প্রতিরোধ বাহিনী এবং ক্যাথলিক চার্চের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল, যারা যুদ্ধের বিধ্বংসী প্রভাব থেকে শিশুদের রক্ষা করতে ভূমিকা রাখে।

যে শিশুদের অনভিপ্রেত সেই পরিস্হিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল, ওরকম অভিজ্ঞতায় তাদের মধ্যে তৈরি করেছিল মিশ্র অনুভূতির অনুরণন। একদিকে, তারা যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে পালানোর এবং নিরাপদ পরিবেশে অস্থায়ী সান্ত্বনা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। অন্যদিকে তাদেরকে নিজের পরিবারের বাইরে গিয়ে নতুন এবং অজানা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। ইচ্ছার বিরুদ্ধে ঘর ছাড়ার অভিজ্ঞতা অনেক শিশুর ভেতর সৃষ্টি করেছিল চিরস্হায়ী ক্ষত।

পরিস্হিতি খানিক স্বাভাবিক হওয়ার পর ওই শিশুরা যখন আবার তাদের নিজের নিজের বাড়ি ফিরে যায়, তখন তাদের অনেককেই সেই পরিস্হিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য যুঝতে হয়। যুদ্ধের কারণে অমূল বদলে যাওয়া পরিবর্তিত এক জীবন তাদের সামনে যেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিল। দ্য চিলড্রেন'স ট্রেন’ ইতালির যুদ্ধ পরবর্তী রূপান্তরের ওপরও আলো ফেলে, যার মধ্যে রয়েছে উত্তরাঞ্চলে কমিউনিস্ট প্রভাব, নারীদের উচ্চকন্ঠ হওয়ার জোর এবং সাক্ষরতার সংগ্রাম।

ইতালির উত্তর এবং দক্ষিণ অঞ্চলের পরিবারগুলোর পারস্পারিক সহমর্মিতা, ভালোবাসা আর সাহসের প্রতি চিলড্রেন'স ট্রেন, সেইসব যাত্রী শিশুদের নিটোল আবেগময় শ্রদ্ধাঞ্জলি। সময় উজিয়ে খ্যাতনামা মিউজিশিয়ান হয়ে ওঠা ছেলেটির অনবদ্য এবং সুকরুণ বেহালার ছড়ার টানের মতো শিল্পীত নির্মাণ এ চলচ্চিত্র। ব্যাকড্রপের অনবদ্য সুরের সঙ্গতে চলমান চিলড্রেন ট্রেন এক মুহূর্তের জন্যও লাইনচ্যুত হয়নি। বাহুল্যবর্জিত বয়ানে আগাগোড়া কাহিনি গ্রুিপে ধরে রাখার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন পরিচালক। কাহিনির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মাপা সংলাপ-অভিনয়, এর সবচেয়ে বড় শক্তি। যার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার অভিনন্দন পাওনা।

ঐতিহাসিক তথ্য এবং কল্পকাহিনির মিশেল ঘটিয়ে আচ্ছন্ন হওয়ার মতো চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছেন পরিচালক এবং সহ স্ক্রিপ্টরাইটার ক্রিস্টিনা কমেনসিনি(Cristina Comencini)। একি শিরোনামে ভায়োলা আরডোনের( Viola Ardone.) উপন্যাসের এক অসাধারণ চলচ্চিত্রায়ন চিলড্রেন'সট্রেন। আগ্রহীরা এ ট্রেনের যাত্রী হতে চাইলে নেটফ্লিক্স প্ল্যাটফর্মে চলে যাবেন।





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাদ যাবে কি মুজিব(বাদ!)?

শান্তির ছদ্মবেশে কি স্বাধীনতাহরণ?

বড় বেদনার মতো বাজে...