সাম্রাজ্যবাদের ছায়া: ফোকল্যান্ড থেকে ভেনেজুয়েলা এবং…



যে কোনো স্বাধীন ভূখণ্ডের মানচিত্র রেখা টেনে নির্ধারিত হয়। সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্বসহ দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি যেখানে দেশটির জনগণ রাষ্ট্রকর্তৃক প্রতিশ্রুত শর্তপূরণের পাশাপাশি রাষ্ট্রকে রক্ষার দায়িত্ব নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান এবং পর্ষদ বা জনপ্রতিনিধির ওপর ন্যস্ত হয়। নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান জনগণের আশাপূরণে ব্যর্থ হলে ক্ষমতা থেকে তার সরে যাওয়া বাঞ্ছনীয়-সুষ্ঠু গণতন্ত্রের চর্চায় এমনটাই দস্তুর। বাস্তবক্ষেত্রে রাজনীতিতে স্বাস্থ্যকর এই চর্চা প্রায় সোনার পাথরবাটি। ফলে মানচিত্রে দাগানো রাষ্ট্রটিকে ঘিরে কেবলমাত্র সীমানার ভেতরই ক্ষমতা দখলের লোভ, নিজেকে আইনের উর্ধ্বে ভেবে নেওয়া এবং বৃহত্তম দেশের দাদাগিরি– এই যাবতীয় চাপের আবর্তে ঘুরপাকের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর সেটি তৈরি হয় দেশটিতে যদি খনিজসম্পদে- বিশেষ করে তেলসম্পদে ঐশ্বর্যময় হয়ে থাকে। তখন তাকে ঘিরে দেশের সীমানা অতিক্রম করে ক্ষমতা প্রয়োগপূর্বক সেই সম্পদ হস্তগতে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াপ্রর্দনের নকশা তৈরি হয়- হয়ে এসেছে এবং হচ্ছে। যার নজির ৩ জানুয়ারি ২০২৬-এ আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হলো। ৩ তারিখ, (সম্ভবত রাত ২:০১ থেকে ৪:২৬ পর্যন্ত) ক্যারিবিয়ান সাগরের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের মানুষরা যখন গভীর ঘুমে ডুবে ছিল; তার দক্ষিণপ্রান্তে তখন বর্ষিত হয় মহা ক্ষমতাশালী মানুষ-নির্দেশিত গজব! স্ত্রী সহ তুলে আনা হয় দেশটির প্রেসিডেন্টকে। আক্রান্ত দেশটির কতজন সামরিক এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে তার হদিশ আমরা জানি না। কিন্তু নিশ্চিত রক্তপাতহীন হয়নি এই আগ্রাসন। কেন এভাবে অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে করতে হলো ক্ষমতার এমন প্রদর্শন? আন্তর্জাতিক আইন কী বলে এর পক্ষে বা বিপক্ষে? চলুন একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক সেসব তথ্য-উপাত্তে:

১.আন্তর্জাতিক আইনের গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক নিয়ম হলো:কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করতে পারবে না। এটি জাতিসংঘ সনদের Article 2(4)-এ স্পষ্টভাবে বলা আছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি।

২.জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৭৪ সালে(৩৩১৪ রেজোলিউশন অনুসারে) আগ্রাসনের একটি আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা দেয়। সেখানে বলা হয়:

(ক) এক রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রবেশ

(খ) বোমা বর্ষণ

(গ) নৌ বা বিমান বাহিনীর আক্রমণ

(ঘ) অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন

এসবই আগ্রাসন (Aggression) হিসেবে গণ্য হবে।

৩. আগ্রাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ এবং সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলোর একটি। মানবিক আইন অনুযায়ী আগ্রাসনকে বলা হয়---“রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ”।এটি শুধু রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপই নয়, এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। 

৪.আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) আগ্রাসনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। রোম স্ট্যাটিউট ও কাম্পালা সংশোধনী অনুযায়ী,আগ্রাসন একটি ব্যক্তিগত অপরাধ — অর্থাৎ এর জন্য রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক নেতা, বা সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ব্যক্তিকে দায়ী করা যায়।

৫.আগ্রাসনের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন দাঁড়ায় কি?
এক শব্দের উত্তর: না। আন্তর্জাতিক আইন আগ্রাসনের পক্ষে কখনো দাঁড়ায় না। এক্ষেত্রে দুটি ব্যতিক্রম রয়েছে:

(ক) আত্মরক্ষা (Self-defense) যদি একটি দেশ আক্রমণের শিকার হয়, তখন সে প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ করতে পারে।

(খ).জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন প্রযোজ্য।

যদি UNSC অনুমতি দেয়, তখন সামরিক অভিযান বৈধ হয়।এর বাইরে কোনো unilateral invasion বৈধ নয়।

৬.এপ্রসঙ্গে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের উদাহরণ টানা যায়। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ স্পষ্টভাবে আগ্রাসন বলে ঘোষণা করেছে।

রাশিয়ার আচরণের প্রেক্ষিতে দেখা গেছে আন্তর্জাতিক আইন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল।

তাহলে এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, ভেনেজুয়েলার মতো ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইন কী বলবে?
এক্ষেত্রে যদি—

(ক) ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রকে আক্রমণ না করে থাকে

(খ) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ অনুমোদন না দিয়ে থাকে

তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের চোখে এটি Aggression হিসেবে গণ্য হবে। কেননা এটি আন্তর্জাতিক আইন এর বিপক্ষে গেছে। দেখা যাক, রাশিয়ার জন্য যা প্রযোজ্য হয়েছিল এক্ষেত্রেও সেটির নির্ধারণ ঘটে কি না।

তো ২০২৬ এর ৩ জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার মাটিতে যে আগ্রাসন চালানো হলো, তা শুধু একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা নয়; এটি লাতিন আমেরিকার দীর্ঘ ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি আবারও একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে প্রবে্শের দৃষ্টান্ত রাখলো।

এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করলেন—নিকোলাস মাদুরো আটক। তাকে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, এবং ভেনেজুয়েলার নিয়ন্ত্রণ এখন ওয়াশিংটনের হাতে। এই ঘোষণা যেন ১৯৮৯ সালের পানামা অভিযানের প্রতিধ্বনি। ১৯৮৯ সালে ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে একইভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল। আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিন থেকে শুরু করে ২০শ শতকের গানবোট ডিপ্লোমেসি—লাতিন আমেরিকা বারবার একই ছায়ার ঘেরাটোপে পড়ে যাচ্ছে।

বিশাল থাবার ছায়ায় আক্রান্ত ভেনেজুয়েলার পথে পথে আতঙ্ক। দোকানপাট বন্ধ, মেট্রো অচল, মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ওষুধ কিনছে। একজন ভুক্তভোগী জানান—“আমাদের এখন শুধু শান্তি চাই।” কিন্তু শান্তি যেন ভূখণ্ড-রাজনীতির সহজ ফল নয়। এই ঘটনার ভেতর দিয়ে মনে পড়ে যায় ফকল্যান্ড যুদ্ধের কথা।

১৯৮২ সালে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যে সংঘর্ষ হয়েছিল, সেটি ফোকল্যান্ড যুদ্ধ হিসেবে খ্যাত। ওই দ্বীপের আয়তন আহামরি বড় ছিল না-- বরং ছোটোই ছিল, কিন্তু জাতীয় অহংকার ছিল বিশাল। আর্জেন্টিনা ঘোষণা দিয়েছিল—সেটি তাদের ঐতিহাসিক ভূখণ্ড। পাল্টা জবাবে ব্রিটেন বলেছিল—ওটি তাদের সার্বভৌম অঞ্চল। মীমাংসার জন্য যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। আর যুদ্ধ মানেই রক্ত-অশ্রু এবং হাহাকারের বিষাদময় তালিকা। ফোকল্যান্ড খ্যাত সেই যুদ্ধে দুপক্ষেরই প্রাণহানি, সম্পদক্ষয় ঘটেছিল। ফোকল্যান্ড আজও দুই দেশের জন্য অমীমাংসিত এক ক্ষত।

ভূখণ্ড নিয়ে সংঘাত শুধু লাতিন আমেরিকা বা দক্ষিণ আটলান্টিকেই সীমাবদ্ধ নয়। কাশ্মীর, ক্রিমিয়া, তিব্বত, পশ্চিম সাহারা, ইরিত্রিয়া-ইথিওপিয়া সীমান্ত—বিশ্বের মানচিত্রে অসংখ্য জায়গায় একই গল্প: একটি দেশের মাটি অন্য দেশের কৌশলগত স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আর সাধারণ মানুষ হয়ে যায় সেই কৌশলের নীরব শিকার।

ভেনেজুয়েলার ঘটনাও তাই কেবল একজন প্রেসিডেন্টের পতন নয়। এটি দুর্বল রাষ্ট্রের ওপর সবল রাষ্ট্রের শক্তির রাজনীতি, তেলের দখলদারীত্ব, এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের পুরোনো খেলার নতুন সংস্করণ। মাদুরোকে “নারকো-স্টেট” পরিচালনার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হোক বা নির্বাচন কারচুপির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হোক—শেষ পর্যন্ত যে বাস্তবতা সামনে আসতে চলেছে, তা হলো:একটি দেশের ভবিষ্যৎ আবারও নির্ধারিত হতে যাচ্ছে তার নিজের জনগণের হাতে নয়, বরং বহিরাগত শক্তির হাত ধরে। এখন ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন ডেলসি রদরিগেজ। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়—এই পরিবর্তন কি সত্যিই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ খুলবে, নাকি এটি হবে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক দখলের সূচনা?

বিশ্বের মানচিত্রে যখনই কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ভেতর প্রবেশ করে. তখন ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয়---ভূখণ্ডের লড়াই কখনোই শুধু ভূখণ্ডের লড়াই নয়। এটি পরিচয়ের, সার্বভৌমত্বের, এবং মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাদ যাবে কি মুজিব(বাদ!)?

বড় বেদনার মতো বাজে...

শান্তির ছদ্মবেশে কি স্বাধীনতাহরণ?