তুমি প্রতিহিংসার আগুনে পোড়াও দেশ জননীর আঁচল


গামীকাল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল(ICT) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে রায় ঘোষিত হতে যাচ্ছে, তা একদিকে যেমন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নাটকের চূড়ান্ত দৃশ্য, অন্যদিকে তেমনি আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এক গভীর সংকটের দৃষ্টান্ত। এই বিচার কোনো স্বচ্ছ আদালত কাঠামোয় ভেতর সংঘটিত হয়নি। হয়েছে একটা বিতর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, যার নিজেরই সাংবিধানিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ, এবং যার কর্মকাণ্ডে জনগণ এরই মধ্যে তিতিবিরক্ত।

বিচারের যে রায় ঘোষিত হতে যাচ্ছে, সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় শেখ হাসিনা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অনুযায়ী, অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচার শুধুমাত্র কঠোর শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য। এখানে সেই শর্তগুলো কি আদৌও মানা হয়েছে? না হয়নি। অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, আইনজীবী নির্বাচনের অধিকার, কিংবা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বোঝার সুযোগ–কোনোটিই নিশ্চিত করা হয়নি। তাছাড়া বাংলাদেশের মতো একটা দেশে যেখানে, একটা খুন কিংবা ধষর্ণ মামলার নিষ্পত্তি হতে কমপক্ষে ৩ থেকে ৬ বছরের মতো সময় লেগে যায়,সেখানে সম্ভবত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে দ্রুততম একটা বিচার কার্যকরের নজির রাখা হচ্ছে। শুধু তাই নয়– এই ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজের আগাপাশতলায় যারা রয়েছেন তারা এই বিচারের জন্য কতটা যৌক্তিক সেটাও একটা ভ্যালিড প্রশ্ন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অস্থিরতা নিয়ে যে অভিযোগের ভিত্তিতে এই বিচার, তার পেছনের সত্য এখনও অজানা। কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি, নেই কোনো সরকারি স্পষ্ট হিসাব। কতজন নিহত হয়েছেন, কে কাকে আঘাত করেছে, অরাজক অবস্থা তৈরির পেছনে কাদের হাত ছিল; এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও ধোঁয়াশাপূর্ণ। বরং বিভিন্ন ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও ডিজিটাল প্রমাণে উঠে এসেছে এমন এক সহিংসতার চিত্র, যা রাষ্ট্রীয় বিবরণীর সঙ্গে মেলে না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই সহিংসতায় বিদেশি শক্তির সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত থাকলেও, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ তদন্ত হয়নি। বরং সেসব ধামাচাপা দিয়ে একতরফা বিচার হয়েছে। স্পষ্টতই, এই বিচারপ্রক্রিয়া পক্ষপাতদুষ্ট এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।

১৯৭৩ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন করে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে খুন হওয়ার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে রাজাকার-আলবদর- অর্থাৎ দালাল আইনটি বাতিল করলেন তবে আইসিটি বলবৎ রাখেন। দীর্ঘ সময় পর, ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এই ট্রাইব্যুনাল পুনরায় সক্রিয় করে, এবং যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে তদন্ত ও বিচার শুরু হয়। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি জামায়াত নেতা আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়, এবং ১২ ফেব্রুয়ারি তা কার্যকর হয়। তিনি পলাতক ছিলেন, তাই রায় অনুপস্থিতিতে দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং নিবিড় পর্যালোচনা ব্যবস্থা বজায় রাখার চেষ্টায় ত্রুটি ছিল না। চাইলে ক্ষমতাশীন সরকারপক্ষ তাড়াহুড়ো করে সমস্ত অপরাধীদের ফাঁসি কার্যকর করতে পারতো। কিন্তু সেরকমটা হয়নি, যার ফলে গণহত্যাকারী আজহারুল ইসলামের বিচার বিলম্বিত হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৫ মে ২০২৫ এ তাকে বেকসুর খালাস দেয়। যদি সত্যি এই বিচারে প্রতিহিংসা মূলচালিকা শক্তি হতো তাহলে আজহারুল ইসলামের জীবিত থাকারই কথা ছিল না। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারে থাকা অধিকাংশই চেষ্টা করেও নিজেদের প্রতিশোধের জিঘাংসা যেন গোপনে ব্যর্থ। তাদের রাগ-ক্ষোভ যতটা না শেখ হাসিনার প্রতি, তারচেয়ে বেশি স্বাধীনতারপক্ষ শক্তিগুলোর প্রতি। সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে থাকা মানুষটিকে ঘিরে। একাত্তর- স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে তাদের ভেতর একরকম অস্বস্তি রয়েছে। ভয়েস অফ আমেরিকার সাংবাদিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারের সময় 'রিসেট বাটনে চাপ' দেবার উল্লেখের সময়ে মোহাম্মদ ইউনুসের অবয়ব জুড়ে থাকা চাপা হাসি, স্মরণ করুন। জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশ যেরকম অস্থিতিশীল এবং ধ্বংসের খেলায় মত্ত, তাতে উপদেষ্টা প্রধান কিংবা সংশ্লিষ্টদের বিন্দুমাত্র ভাবিত মনে হয়েছে? জামাততোষণ এবং আড়ালে থাকা শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নের চিন্তাই যেন তাদের বেশি ব্যতিব্যস্ত রাখে। মূলতঃ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ গ্রহণ এবং বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে যেন অতিরিক্ত তাড়াহুড়োয় ২০২৫ এর ১৭ নভেম্বরের প্রহসনের এই বিচারের নাটক সাজানো হয়েছে। যা শুধু বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নয়, বরং গণতন্ত্রের ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

আর সেটা করা হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন দেশের মানুষ ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য আকুল, তখন এই রায় যেন এক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মোড়কে মোড়ানো নাটক। হ্যাঁ মানছি এই মুহূর্তে বাংলাদেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অনেক দাপট। সবুজডালেই পাখি বসতে ভালোবাসে। বিপুলসংখ্যক স্বার্থপর, পাকিস্তানপন্থী আপাত শেখ হাসিনা বিরোধীতা দেখালেও তাদের মূল আক্রোশ বাংলাদেশের প্রতি। তাদের স্বপ্নের পাকিস্তানের অখণ্ডতার মুখে ঝামা ঘষে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল যে বাংলাদেশ– সেই দেশটা ধ্বংস হলেই তাদের শান্তি। এবং তারা সর্বতোভাবে বাংলাদেশের অমঙ্গল হোক সেটাই চায়। এর বিপরীতে বাংলাদেশ পক্ষের মানুষেরা এই রায়কে কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না। কারণ বাংলাদেশ তাদের আত্মার অংশ।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশে আওমীলীগকে নিষিদ্ধ করে– লীগের সঙ্গে সামান্যতম সংশ্লিষ্টতার অজুহাতে নির্মমতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত রেখেও খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। কোণঠাসা আওয়ামীলীগ যেন ফিনিক্সপাখির মতো ডানা মেলতে শুরু করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের আগে যে দলের জন্ম, যে দল মুক্তিযুদ্ধে রেখেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সে দলকে নিচিহ্ন করা মুশকিলই বটে। মার খেয়েও দলটি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে– ইউনুস প্রশাসনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বাংলাদেশের প্রশ্নে সচেতন মানুষের ভেতর ছড়াচ্ছে ইউনুস বাহিনীর প্রতি ক্ষোভ। এরকম একটা অস্থিতিশীল অবস্থার ভেতর তড়িঘড়ি করে আইসিটি’র মাধ্যমে বিচারের নামে যে প্রতিহিংসার নাটক মঞ্চস্থ হতে চলেছে তা গ্রহণযোগ্যতা রাখতে ব্যর্থই হবে। বিচার যদি করতেই হয় নির্বাচিত কোনো সরকারের মাধ্যমে সেটা হতে পারে। এবং সেটা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। এভাবে একপাক্ষিক এবং অযৌক্তিক বিচারের দৃষ্টান্ত বাংলাদেশকে আরো বেশি অস্থিতিশীলতার দিকেই ঠেলে দেবে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশকে বুকে বয়ে বেড়ানো মানুষ মাত্রই তার বিরোধীতা করবেন বলেই বিশ্বাস।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাদ যাবে কি মুজিব(বাদ!)?

বড় বেদনার মতো বাজে...

শান্তির ছদ্মবেশে কি স্বাধীনতাহরণ?