ছাগস্থান




ন জুড়ে ভারি মচ্ছব শুরু হয়েছে। দলে দলে ছুটে আসছে ছোটো বড় ইতর প্রাণীর দল। ছাগকুলের আনন্দ সবচেয়ে বেশি। ভেড়ার পালও পিছিয়ে নেই। সবার চোখেমুখে খুশি যেন ফেটে পড়ছে। তাদের বহুদিনের গোপন প্রতীক্ষা এতদিনে পূর্ণতা পেয়েছে। হাতি গর্তে পড়েছে। তাই তাদের বাঁধভাঙা এই আনন্দ। উনপঞ্চাশ বছর হতে চলেছে এ অঞ্চলে কোনো বাঘ-সিংহ নেই। তাদের হত্যা করা হয়েছে। ইতর প্রাণীদের হাতেই তাদের মৃত্যু ঘটেছিল। তারপর সুদীর্ঘকাল ধরে সেই বনের রাজত্বে ছিল কখনো অজগর কখনো হায়েনা।

দূরের গাঁ উজিয়ে বনে এসেছিল এক হাতি। বনটার প্রতি তার মায়া জন্মে যাওয়ায় সে আর নিজের গাঁয়ে ফিরে যায়নি।

শরীরে বড়সড় হলেও হাতির ঘটে তেমন বুদ্ধিশুদ্ধি ছিল না। তার মনটা ছিল নরম সরম। যে যাই বলতো তাই সে বিশ্বাস করে বসতো। হাতিটা যখন বনে আসে, অজগর আর হায়েনা তখন যুযুধানে মত্ত। কে কাকে গিলে খাবে তারই যেন প্রতিযোগিতা। শেষমেশ হায়েনার কামড়ে অজগর পটল তুললো। তার বউ বাচ্চারা বন ছেড়ে পালিয়ে বাঁচলো। হায়েনা হলো বনের রাজা। নতুন রাজার নানান ভুজুংভাজুং আর স্বৈরাচারী ব্যবহারে বনের প্রাণীগুলো অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। তারা তখন হায়েনার পরিবর্তে মনেপ্রাণে নতুন কেউ বনের রাজা হোক সেটা চাইছিল। কিন্তু হায়েনা তা কিছুতেই হতে দেবে না। নিজের দলের আন্ডাবাচ্চা হায়েনাগুলোকে নিরীহ প্রাণীদের দিকে লেলিয়ে দিলো। তাড়া খেয়ে সবাই এদিক ওদিক পালিয়ে যেত। তখন অনেকেই হাতির বিশাল শরীরের আড়ালে গিয়ে লুকাতো। এভাবে কিছুকাল কাটবার পর, একদিন সবাই মিলে ঠিক করলো হাতিই হবে তাদের নতুন রাজা। বিপদে আপদে কেমন দিব্যি সে তার বুক দিয়ে তাদের আড়াল করে। বনের জন্য তার এতটাই মায়া যে নিজের গাঁয়ে পর্যন্ত ফিরে যায়নি। এমন একজনই রাজা হওয়ার যোগ্য। কিন্তু হায়েনাটাকে জব্দ করবে কীভাবে? সবাই মিলে রুখে দাঁড়ালে ব্যাটা ল্যাজ গুটিয়ে ঠিকই পালাবে। বুদ্ধি মতো এক সকালে সবাই মিলে গিয়ে অতর্কিতে হামলা চালালো। হায়েনা যতই ধুরন্ধর হোক, হঠাৎ আক্রমণের মুখে পড়ে সে চোখে অন্ধকার দেখলো। এদিকে তার সঙ্গীসাথীরা বিপদ বুঝে পিঠটান দিয়েছে। প্রস্তুত না থাকায় একা একা লড়াইয়ের সাহস না দেখিয়ে হায়েনা সত্যি সত্যি ল্যাজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হলো।

হাতিকে মহাআড়ম্বরে বনের রাজা বানানো হলো। সাতদিন ধরে চললো আনন্দ উৎসব। প্রথম কয়েক বছর সবার ভালোই কাটলো। এত ভালো একজন রাজা যার সবদিকেই নজর, ভালো না থাকার তো কোনো কারণই নেই। এদিকে হাতির সঙ্গে বনের বুড়ো শিয়ালের খুব বন্ধুত্ব হলো। আগে হাতি গোটা বন ঘুরে নিজের চোখে দেখতো কোথায় কার কোন সমস্যা ইত্যাদি। শিয়াল হাতিকে বুদ্ধি দিলো, ‘রাজার কাজ তো ওসব না। তার কাজ হলো শুয়ে বসে আরাম করা আর হুকুম দেওয়া। বিশালদেহী হাতির ওসব কাজ মানায়ও না। বনের ইতর প্রাণীরা রয়েছে কেন শুনি?’ এছাড়াও শিয়ালটা রাজাকে প্রায় নানা কানকথায় উত্তপ্ত করে তুলতো। হাতিটা তখন রেগেমেগে বন দাপিয়ে বেড়াতো। ভয়ে সবাই যে যেদিকে পারতো গিয়ে লুকাতো।

আস্তে আস্তে এমন হলো যে বনের পশুপাখিদের খোঁজ খবর নেওয়া তো দূরের কথা, আগে থেকে দেন দরবার করে না এলে রাজার দর্শনই পাওয়া যেত না। খালি হাতে কেউ এলে শিয়ালের পরামর্শ মতো তাকে দরবারে ঢুকতে দেওয়া হতো না। রাজার সঙ্গে সাধারণ পশু প্রাণীদের দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করলো। বদমাশ শিয়ালটা এদিকে তার চ্যালাচামুণ্ডাদের ভিড়াতে লাগলো হাতির চারপাশে। অবস্থা এমন দাঁড়ালো হাতি নামে মাত্র রাজা রইল, আর সব মাতব্বরিতে বুড়ো শিয়াল আর তার দলবল। এদিকে হাতিকে শিয়াল কানপড়া দিতে দিতে এমন অহংকারী তৈরি করেছে যে নিজেকে সে বনের একচ্ছত্র মালিক বলে ভাবতে শুরু করলো। বনের অন্যান্য বাসিন্দাদের সুখ দুঃখ নিয়ে সে আর একদমই ভাবতো না। শিয়ালের দল দুইহাতে লুটেপুটে বনটাকে প্রায় খালি করে ফেললো।

খাদ্যের অভাবে পশুপাখিদের শুকিয়ে মরবার দশা হলো। দলে দলে তারা রাজার কাছে নালিশ জানাতে এলো। শিয়ালের দল আগেভাগেই প্রস্তুত ছিল, তাদের কিছুতেই রাজার কাছে ভিড়তে দেওয়া যাবে না। এদিকে নিজেদের অভাব অনটন নিয়ে নালিশ জানাতে আসা পশুপাখিদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হইহট্টোগোলও বেড়ে গেল। রাজার কানে গিয়ে পৌঁছালো সেই কোলাহল। ‘ঘটনা কি?’ হাতি জানতে চাইলো। বদের হাড্ডি শিয়াল তাকে জানালো, 'ওদের সাধারণ খাদ্যে অরুচি হয়েছে মহারাজ।' ‘আহা তবে কি খেতে চায় ওরা?’ শিয়াল শরীর বেঁকিয়েচুরিয়ে নানা ভঙ্গী ধরে। ভাবখানা এমন কথাটা বলতে তার খুব কষ্ট হচ্ছে। 'আহা বলোই না, ওরা কী চায় শুনি।' শিয়াল তখন ভাব ধরে বললো, 'মহারাজ, বলিহারি সাহস ইতরগুলোর। ওরা আপনার মাথার ঘিলু খেতে ইচ্ছুক। কত্তবড় দুঃসাহস বলুন!' শিয়ালের কথা শুনে হাতি তো রেগে আগুন। 'কী! সত্যিই তো ভারি দুঃসাহস ইতরগুলোর। নইলে যতবড় মুখ নয় তারচেয়ে বড় কথা বলে কীভাবে। দেখাচ্ছি ঘিলু খাওয়া।'

ভারী ভারী পায়ে থপথপিয়ে হাতি ওদের সামনে গিয়ে বললো, 'যা ফিরে যা, নিজের নিজের ঘিলু খা।'

সববেত পশুরা তো অবাক। এমন অদ্ভুত কথার অর্থ তারা বুঝে উঠতে পারলো না। বুড়ো শিয়াল তক্কে তক্কেই ছিল। সে করুণ মুখ করে তাদের বোঝালো, 'রাজা তোমাদের নিজেদের মাথার ঘিলু খেয়ে খিদে মিটাতে বলেছেন।' তারপর হাতির কান বাঁচিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বললো, 'দেখো কাকে রাজা বানিয়েছো তোমরা। এমন নিষ্ঠুর রাজা ত্রিভুবনেও দেখিনি বাপু, যে প্রজাদের মাথা খাবার পরামর্শ দেয়। তোমাদের উচিত এমন পাষণ্ড রাজাকে লাথি মেরে রাজ্যছাড়া করা।’

শিয়াল কথা শেষ করে সঙ্গীসাথীদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় গিয়ে লুকিয়ে পড়লো। উপস্থিত পশুপাখির দল শিয়ালের কথা শুনে ক্ষোভে দুঃখে হা রে রে রে করে ছুটে আসতে শুরু করলো হাতির দিকে। বিপদটা বুঝতে দেরিই হলো হাতির। দশাসই শরীর নিয়ে হাতি পালাতে গিয়ে গর্তে পা আটকে গেল। দুঃখের কথা হলো বন জুড়ে ছোটো বড় যেসব গর্ত রয়েছে, সেগুলো হাতির নিজেরই তৈরি। শিয়ালের কানকথায় প্রায় সে রেগে গিয়ে মাটিতে পা ঠুকে ঠুকে গর্তগুলো তৈরি করেছে। এখন নিজেই তারই তৈরি একটা বড়সড় গর্তে পড়েছে।

যত সে হাঁচড়ে পাঁচড়ে উঠতে চায়, ততই তার পা আরো গভীরে দেবে যায়। শেষে অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে তার আর নড়বার ক্ষমতাই থাকলো না। দলে দলে ইতর প্রাণীর দল এসে যে যেভাবে পারলো হাতিকে লাথি মারতে শুরু করলো। এমন কী তস্য চামচিকা, যারা কি না ভয়ে কখনও হাতির সামনেও পড়তে চাইতো না। তারাও দলে দলে এসে হাতিকে লাথি মেরে গেল। লাথির আঘাতে যত না কষ্ট পেলো, মনের আঘাত তারচেয়ে ঢের বেশি কষ্ট দিলো হাতিকে। একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে হাতিটা মারা গেল।

বনের ছোটো বড় প্রাণীগুলো আনন্দে নেচে উঠলো। প্রতিবারই তারা তাদের একাট্টাশক্তির পরিচয় রাখে, এবারও তার ব্যত্যয় ঘটলো না। ওদের চাওয়া তো খুবই সামান্য। দুবেলা খেয়েপরে শান্তিতে থাকতে চাওয়া। রাজা হওয়ার লোভ ওদের থাকে না--নেইও। রাজা হওয়ার মতলব যাদের, তারা ওদের এরকম একাট্টা রোষের অপেক্ষায় থাকে বছরের পর বছর। এক রামছাগল বনটাকে নিজেদের আস্তানা তৈরির মতলবে বহুবছর ধরে অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু এতদিন সুবিধা করে উঠতে পারছিল না। রাজা হওয়ার মতো যোগ্য একজনের খোঁজাখুঁজি শুরু হতেই সে লুকানো জায়গা থেকে বেরিয়ে এলো। দাড়িহীন মুখ নেড়ে, মধুর কণ্ঠে সে এমন সব কথা বনের পশুপাখিদের শোনালো যা শুনে সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নিলো রামছাগল রাজা হওয়ার যোগ্য বটে।

অতএব বনের নতুন রাজা হলো রামছাগল। পশ্চিমের কোনো এক জঙ্গলের বাসিন্দা সে। বনের ভেতর এতদিন ঘাপটি দিয়ে লুকিয়ে ছিল। এই বনটার ওপর তার দলের অনেকদিনের লোভ। এতদিন বনের আনাচে কানাচে ঘাপটি দিয়ে থাকা রামছাগলের যত ছদ্মবেশী বন্ধুবান্ধব ছিল, সময় মতো সবাই বেরিয়ে এসে তার চারপাশে জড়ো হলো। এবার বনটাকে তারা নতুন করে সাজাতে চায়। নাম দিতে চায় ছাগস্থান। পশ্চিমের জঙ্গল থেকে রামছাগলের জ্ঞাতিগুষ্টিরাও রওনা দিয়েছে, তারা এসে পৌঁছালো বলে।

[রচনা:১৭ আগস্ট, ২০২৪]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাদ যাবে কি মুজিব(বাদ!)?

শান্তির ছদ্মবেশে কি স্বাধীনতাহরণ?

বড় বেদনার মতো বাজে...