বাংলাদেশে হাম–সংকট: টিকাদান ব্যবস্থার পতন ও শিশু মৃত্যুর ট্র্যাজেডি
আমরা কতটা অবিবেচক নির্মম হতে পারি, শিশুদের জীবন নিয়েও রাজনীতি করতে দ্বিধা হয় না। কেন বলছি এমন কথা? দেশে হামের প্রাদুর্ভাব আর নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোকে মরতে দেখে অসহায় রাগে ক্ষোভে কেবলি জ্বলছি। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে টিকাদান কর্মসূচির এক উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি ছিল। গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (GAVI) ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সাফল্যকে স্বীকৃতি দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে(মুখটা গুল করে বলুন ফে–সি–স্ট) সম্মানিত করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে ইপিআই (Expanded Programme on Immunization) ছিল দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ। যেখানে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস পরিশ্রম ও সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো টিকাদানকে রেখেছিল স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে স্বাস্থ্যখাতের নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়, যার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকা সরবরাহে।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসে স্বাস্থ্যখাতের ৫ম সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে ইপিআইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা কেনার প্রক্রিয়া থমকে যায়। ফলে ২০২৫ সালে দেশে দেখা দেয় গুরুতর টিকা সংকট। যক্ষ্মা, হাম, পোলিওসহ ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুদ শেষ হয়ে যায়। ইপিআইয়ের নিয়ম অনুযায়ী; ৯ মাস বয়সে শিশুকে এমএমআর/এমআর-এর প্রথম ডোজ, ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। কিন্তু টিকা না থাকায় এই চক্র ভেঙে পড়ে, আর তার সরাসরি ফল হিসেবে দেশে শুরু হয় হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব।
ডেটা স্পষ্টত দেখাচ্ছে কীভাবে ২০২৫ সালে কভারেজের ধস্ নামলো। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত MR1 ও MR2 টিকাদানের প্রশাসনিক কভারেজ ছিল সাধারণত ৮৬% থেকে ১০০%+। কিন্তু ২০২৫ সালে তা হঠাৎ নেমে মাত্র ৫৯.৬%–এসে ঠেকলো। এই যে পতন, এটা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের একটি স্পষ্ট সংকেত।
২০২৫ সালের শুরু থেকেই দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম–আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়তে থাকে। মার্চ মাসেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ৪০ জনের বেশি শিশু মারা যায়। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ উঠছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪১,৯৩৮ কোটি টাকা। তবুও কেন জীবনরক্ষাকারী টিকা আমদানি বন্ধ হয়ে গেল? এ প্রশ্নের উত্তর কার কাছে চাইবো আমরা?
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এক মাসে ১৯ শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। যা শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেঙে পড়ার নির্মম দলিল। কোথায় এই বিপর্যয় মোকাবেলায় সর্বোচ্চ শক্তি লাগানো হবে, তা না; শুরু হয়েছে বিগত সরকারের ওপর দোষ চাপানোর চাপান উতোর। যদিও এই বিপর্যয়ের সম্পূর্ণ দায় অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিবাহিনীর। বিভিন্ন ডেটা-তথ্য উপাত্ত তার স্পষ্ট প্রমান দিচ্ছে। তারপরও বর্তমান সরকারের মহামান্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভুলভাল বকে চলেছেন। তার ভাষ্য মতে, ‘গত ৮ বছর ধরে দেশের হামের টিকা দেয়া হয়নি।’ সত্যিই কি তাই? তথ্য-উপাত্ত তাই বলছে কি? যদি গত ৮ বছরে হামের টিকা দেওয়া না-ই হয়ে থাকে তাহলে সেই বছরগুলোতে কি হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল? কতজন শিশুর মৃত্যু হয়েছিল বিগত ৮ বছরে?
এই দায় কার? এবেলা রতন কোনো কথা না কহিলেও আমরা বলতে বাধ্য। দেশের সাধারণ মানুষ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আর অসহায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা যদি শিশুদের মৃত্যুর জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান ভুল হবে কি? না, হবে না। কারণ তাদের বিরুদ্ধে রয়েছে সুনির্দিষ্ট এবং অকাট্য অভিযোগ। কেন তারা সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ করে টিকা ক্রয় ব্যাহত করেছিলেন? ছাগল দিয়ে হাল চাষ হয় না সেটা একজন ডিগ্রিহীন চাষীও জানেন– এটি রকেট সায়েন্স নয়। অথচ আমাদের বিদ্বান মহাজন না বুঝেশুনেই স্বাস্থ্যখাতে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিলেন– সেটা আমাদের বিশ্বাস করতে বলেন? ঠিক আছে, দুর্নীতির পাশাপাশি স্বজনপ্রীতিতেও আমরা চ্যাম্পিয়ন, কষ্ট হলেও সেটা তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমকে কোন যুক্তিতে অবহেলা করা হলো? আর টিকা সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার পরও কার্যকর পদক্ষেপ কেন নেওয়া হলো না?




মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন