The Six Triple Eight






‘চিঠির প্রেরক ভাইয়া-বাবা, প্রাপক গোটা দেশ

একবাক্যে চিঠি শুরু একবাক্যেই শেষ।


চিঠির ভেতর একটা মোটে কথা,


এই নে স্বাধীনতা।’


নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীনতার চিঠি পেয়েছিল বাংলাদেশ। একাত্তরের যুদ্ধময় সেই দিনগুলোতে যোদ্ধারা কতভাবেই না প্রিয়জনের কাছে চিঠির হাত ধরে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন তাঁদের বার্তা। পোস্ট অফিসগুলো তখন অধিকাংশই বিকল, পোস্টম্যান অনেকেই হয়তো হত্যার শিকার। কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে সরে গেছেন নিরাপদ কোথাও। কিংবা যোগ দিয়েছেন স্বাধীনতার যুদ্ধে। যুদ্ধরত মানুষগুলোর চিঠি যাওয়া-আসা করতো তাঁদের কোনো সহযোদ্ধা বা পরিচিত কারো মাধ্যমে। বহু পথ পেরিয়ে, কৌশলের আশ্রয় নিয়ে হতো চিঠির লেনদেন। ‘একাত্তরের চিঠি’ বইটিতে সেরকম প্রচুর বিষাদঘন চিঠি আছে। যুদ্ধ মানেই শত্রু শত্রু খেলা– স্বাভাবিকত্বের বনবাস। তা সত্ত্বেও প্রিয়জনের কাছে খবরাখবর পৌঁছানোর আকুতির মুখে তো লাগাম পরানো সম্ভব না।

যুদ্ধের ময়দানে লড়াকু একজন সৈনিক তিনি যতই জাঁহাবাজ হন না কেন, প্রিয়জনের বিচ্ছেদে ভেতরে ভেতরে ঠিকই তিনি/তাঁরা মুষড়ে থাকেন। পরিবার পরিজন ছেড়ে আসা সৈন্যদের মনোবল চাঙ্গা করার মহৌষধ প্রিয়জনের কাছ থেকে পাওয়া চিঠি। অন্যদিকে যেসব বাড়ির ছেলেমেয়ে, স্বামী কিংবা ভাই-বোন-বাবা, যাদে পেছনে রেখে যুদ্ধে চলে যান, পরিবারের তারাও বিষাদগ্রস্ত থাকেন খবর না পেলে। পোস্টম্যানের উপস্থিতি মানেই তাদের মনে যুদ্ধের ময়দান থেকে বার্তা পাওয়ার হাতছানি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যবাহিনী যখন ইউরোপের নানা ফ্রন্টে যুদ্ধ করছিল; তখন তাঁদের লেখা চিঠি কিংবা তাঁদেরকে লেখা চিঠিগুলো ঠিক মতো বিলিবন্টনে বড় রকমের ঘাপলা তৈরি হয়েছিল। মাসের পর মাস যুদ্ধরত মানুষগুলো না পেয়েছেন প্রিয়জনের দেখা, না লেখা। একই ঘটনা তাঁদের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও ঘটে চলেছিল। যুদ্ধরত এক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য মারফত বিষয়টা অবগত হওয়ার পর তার সুরাহায় প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্ত্রী এ্যালেনর রুজভেল্ট এবং মেরি ম্যাকলিওড বেথুন, যিনি National Association of Colored Women এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন।

মার্কিন প্রশাসন ইউরোপের যুদ্ধের ময়দানে তাদের সৈন্য এবং পরিবারের চিঠি বিলিবন্টনের বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসে। তার ভিত্তিতে ইউরোপে পাঠানো হয় The Six Triple Eight এর সেনা ইউনিটের আফ্রিকান আমেরিকান নারীবাহিনীকে। যার নেতৃত্বে ছিলেন মেজর অ্যাডামস(কেরি ওয়াশিংটন)। ইউরোপের বৈরিপরিবেশে সিক্স ত্রিপল এইটের নারীবাহিনীকে তিন তিনটি অবস্থার সঙ্গে যুঝতে হয়। এক. তারা নারী, দুই. তাদের গাত্রবর্ণ এবং তৃতীয়টি যুদ্ধ। বর্ণবাদ, লিঙ্গবাদ এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে কীভাবে তারা বিভিন্ন ফ্রন্টের সৈন্য এবং তাদের পরিবারের কাছে হাজার হাজার ব্যাকড-আপ মেল এবং পার্সেল সরবরাহ করার প্রক্রিয়া তৈরি করেছিলেন, সে গল্প বলেছে The Six Triple Eight.

The Six Triple Eight সত্যি কাহিনি নিয়ে তৈরি। পুরুষ এবং শ্বেতাঙ্গ সুপ্রিমেসির বেঁধে দেওয়া নিদির্ষ্ট সময়ের ভেতর কীভাবে আফ্রিকান আমেরিকান নারীবাহিনী হাজার হাজার চিঠি বিলিবন্টনের যুদ্ধে নেমেছিলেন, সেই বাস্তব কাহিনিতে জুড়েছে উপকাহিনি। এ নিয়ে ব্যক্তিগত মতামত হলো, উপকাহিনির প্লট বেশ দুর্বল- ততোধিক দুর্বল প্রেমিকা চরিত্রটির অভিনয়। একটা আরোপিত প্রেম কাহিনির দিকে নজর দিতে গিয়ে, ঐতিহাসিক সত্যি ঘটনার প্রতি কিছুটা অবিচার করা হয়েছে। এমনিতেই আমেরিকান আফ্রিকান নারীদের ইতিহাসে অবদান প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। সেরকম অবহেলিত নারীদের নিয়ে ২০১৬তে থিওডর মেলফি তৈরি করেছিলেন Hidden Figures. সেখানে ৬০ এর দশকে মহাকাশ কর্মসূচিতে জড়িত আফ্রিকান আমেরিকান নারীদের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছিল। ইতিহাসে অবদান রাখা আনসাং হিরোজদের নিয়ে যদি চলচ্চিত্র তৈরি করতেই হয় তাতে আন্তরিকতার সঙ্গে সঙ্গে যথার্থ যত্নও প্রয়োজন। যা Hidden Figures চোখে পড়েছিল।

সত্যিকথা বলতে The Six Triple Eight এর ট্রেলার খুব চমৎকার লেগেছিল। কিন্তু ট্রেলার যতটা গর্জন করেছিল চলচ্চিত্রে ততটা বর্ষায়নি। মেজর অ্যাডামসের অভিনয় মন্দ ছিল না। অজানা একটা বিষয়ে জ্ঞানপ্রাপ্তের অভিজ্ঞতা হলো, এই বা কম কী।



মন্তব্যসমূহ